কোরআনের বাণী
নারীর সম্মান রক্ষায় ইসলামের অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২৩
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَرۡمُوۡنَ الۡمُحۡصَنٰتِ الۡغٰفِلٰتِ الۡمُؤۡمِنٰتِ لُعِنُوۡا فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ۪ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ
২৩. যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-নির্মলচিত্ত, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা তো দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
এই আয়াত মূলত উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর বিরুদ্ধে মুনাফিকদের জঘন্য অপবাদের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি ‘হাদিসে ইফক’ নামে পরিচিত। মুনাফিকরা তার পবিত্র চরিত্রে আঘাত হেনে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে ওহি নাজিল করে তার নিষ্কলুষতা ঘোষণা করেন। ফলে এ আয়াত শুধু আয়েশা (রা.)-এর মর্যাদাই প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং কেয়ামত পর্যন্ত মুসলিম সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা দিয়েছে।
আয়াতে ব্যবহৃত “الْغَافِلَاتِ” (গাফিলাত) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে এর অর্থ উদাসীন বা অমনোযোগী নয়; বরং এমন সরল, ভদ্র, পবিত্র ও নিষ্কলুষ নারী, যারা অশ্লীলতা, কুপ্রবৃত্তি ও ছলচাতুরী থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তারা অসৎ কাজ কল্পনাও করতে পারে না। তাদের হৃদয় কলুষমুক্ত। তারা এমন পরিবেশে বড় হন, যেখানে লজ্জাশীলতা, সতীত্ব ও ঈমান তাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়। তাই তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া শুধু একটি ব্যক্তিকে আঘাত করা নয়; বরং সমাজের পবিত্রতা ও নৈতিক ভিত্তিকে আক্রমণ করা।
এ কারণেই ইসলাম এ অপরাধকে ভয়াবহ কবিরা গুনাহ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন— ‘সতী-সাধ্বী, নিষ্কলুষ মুমিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া।’ (বুখারি, হাদিস ২৭৬৬; মুসলিম, হাদিস ৮৯)
এই আয়াতে ‘মুহসানাত’, ‘গাফিলাত’ ও ‘মুমিনাত’ তিনটি শব্দ পাশাপাশি এনে আল্লাহ তাআলা অপবাদপ্রাপ্ত নারীদের তিনটি মহান গুণ তুলে ধরেছেন। তারা চরিত্রবান, তারা নিষ্কলুষ এবং তারা ঈমানদার। অর্থাৎ তাদের জীবনের ভিত্তিই হলো পবিত্রতা। অথচ এমন নারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া মানুষের নৈতিক পতনের চরম নিদর্শন।
আয়েশা (রা.) ছিলেন এ গুণগুলোর উজ্জ্বল প্রতীক। তার মর্যাদা এত উচ্চ ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বিবাহের আগেই জিবরাইল (আ.) রেশমি কাপড়ে তার ছবি নিয়ে এসে বলেন, ‘তিনি আপনার স্ত্রী।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৮০)
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী। তার কোলেই রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেন এবং তার ঘরেই সমাধিস্থ হন। এমনকি ওহি নাজিলের বিশেষ মুহূর্তেও তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকতেন। এসব বৈশিষ্ট্য তার অনন্য মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।
সবচেয়ে বড় সম্মান হলো আয়েশা (রা.)-এর নির্দোষ হওয়ার ঘোষণা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কোরআনের আয়াত নাজিল করে দিয়েছেন। অন্যদের ক্ষেত্রে কোনো সাক্ষী বা অলৌকিক ঘটনা দ্বারা সত্য প্রকাশ করা হলেও আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াত হওয়া কোরআনের আয়াতে সংরক্ষিত হয়েছে। এটি তার জন্য এমন মর্যাদা, যা পৃথিবীর আর কোনো নারীর ভাগ্যে জোটেনি।
তাফসিরকারগণ সুন্দরভাবে তুলনা করেছেন; ইউসুফ (আ.)-এর নির্দোষিতা প্রকাশে একটি শিশু সাক্ষ্য দিয়েছিল, মারইয়াম (আ.)-এর পবিত্রতা প্রমাণে শিশু ঈসা (আ.) কথা বলেছিলেন; কিন্তু আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর সম্মান রক্ষায় আল্লাহ তাআলা সরাসরি কোরআনের আয়াত নাজিল করেছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, একজন মুমিন নারীর সম্মান আল্লাহর কাছে কত মূল্যবান।
এ আয়াত বর্তমান সমাজের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুজব ও চরিত্রহননের সংস্কৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যাচাই ছাড়া কারো বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়ে দেওয়া, বিশেষত নারীদের সম্মান নিয়ে কটূক্তি করা অনেকের কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলাম এটিকে দুনিয়া ও আখিরাতের অভিশাপের কারণ বলেছে।
এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, একজন মুমিনের জিহ্বা হতে হবে পবিত্র, তার ভাষা হতে হবে সংযত এবং মুমিন কারো সম্মানহানির কারণ হবে না। বিশেষ করে সতী-সাধ্বী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া এমন অপরাধ, যার শাস্তি শুধু সামাজিক নয়; বরং আখিরাতেও ভয়াবহ। তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের চোখ, কান ও জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোনো খবর প্রচারের আগে সত্যতা যাচাই করা।
আয়েশা (রা.)-এর ঘটনা আমাদের জন্য আরো একটি বড় শিক্ষা প্রদান করে। তা এই যে, মানুষের অপবাদ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা চিরস্থায়ী। পৃথিবীতে মিথ্যার ঝড় যত প্রবলই হোক, সত্য একদিন আল্লাহর পক্ষ থেকেই বিজয়ী হয়।




