অফিসে দায়িত্ব পালনও যেভাবে হতে পারে ইবাদত

প্রতীকী ছবি
ইসলামে ইবাদত শুধু নামাজ, রোজা, জাকাত বা হজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতিটি বৈধ কাজ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং শরিয়তের সীমারেখা মেনে করা হয়, তবে সেটিও ইবাদতে পরিণত হতে পারে। তাই একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কৃষক কিংবা অফিসকর্মী নিজের দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে তার কর্মজীবনও ইবাদতের অংশ হয়ে ওঠে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২)। এ আয়াত একজন মুমিনকে শেখায় যে জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হলে তা ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে।
অফিসের দায়িত্ব একটি আমানত। নিয়োগকর্তা কর্মীর ওপর নির্দিষ্ট সময়, শ্রম ও দায়িত্বের যে বিশ্বাস অর্পণ করেন, তা যথাযথভাবে পালন করা ইসলামী নৈতিকতার দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৫৮)। তাই কর্মঘণ্টায় অবহেলা, অযথা সময় নষ্ট, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের অপব্যবহার আমানতের খিয়ানতের শামিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ভালোবাসেন সেই ব্যক্তিকে, যে যখন কোনো কাজ করে, তখন তা দক্ষতা ও উৎকর্ষের সঙ্গে সম্পন্ন করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি, হাদিস: ৮৯৭)। তাই কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব, সময়ানুবর্তিতা ও মানসম্মত কাজ মুসলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
অফিসে সততা বজায় রাখাও ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান, হিসাব গোপন করা বা সহকর্মীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০২)। একজন মুসলিম কর্মী তাই সব পরিস্থিতিতেই সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দেবেন।
কর্মক্ষেত্রে উত্তম আচরণও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। সহকর্মীদের সম্মান করা, অধস্তনদের প্রতি সদয় হওয়া, ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে শালীন আচরণ করা এবং দলগত কাজে সহযোগিতা করা ইসলামের শিক্ষা। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সূরা আল-মায়িদা, ৫:২)।
কর্মজীবনে ভারসাম্য রক্ষাও জরুরি। অফিসের ব্যস্ততার কারণে ফরজ ইবাদত অবহেলা করা যেমন অনুচিত, তেমনি ইবাদতের অজুহাতে অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। কর্মস্থলে সৎ উপার্জনের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের হালাল জীবিকা নিশ্চিত করাও একটি মহৎ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মানুষ নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো আহার করেনি।’ (বুখারি, হাদিস: ২০৭২)।
কাজেই অফিসে দায়িত্ব পালন কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভেরও একটি পথ। সঠিক নিয়ত, আমানতদারি, সততা, দক্ষতা ও নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করলে প্রতিদিনের কর্মঘণ্টাও ইবাদতের সওয়াবে পরিণত হতে পারে। তখন অফিস শুধু কাজের স্থান নয়, বরং চরিত্র গঠন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




