কোরবানির পশু নিয়ে কনটেন্ট তৈরির শরয়ি বিধান

ছবি: এআই
বর্তমানে কোরবানির পশু নিয়ে ভিডিও, রিলস ও বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেকে শখে, অনেকে দর্শক আকর্ষণের জন্য, আবার কেউ কেউ মনিটাইজড প্ল্যাটফর্মে আয় করার উদ্দেশ্যে এসব ভিডিও তৈরি করেন। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কোরবানি নিছক সামাজিক আয়োজন নয়; এটি একটি মহান ইবাদত। আর ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায় যখন সেখানে রিয়া, প্রদর্শনী বা দুনিয়াবি স্বার্থ প্রবেশ করে।
দেশের আলেম সমাজ বিষয়টি নিয়ে নানা মাধ্যমে সতর্ক করে নিজেদের ভাষ্য তুলে ধরেছেন। বিষয়টি নিয়ে তরুণ আলেম ও সাংবাদিক মুফতি মুহাম্মাদ মর্তুজার কাছে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, আমি আজই আমার ভেরিফায়েড ফেসবুকে এটি নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছি, তা দেখতে পারেন। সেখানে তিনি যা লিখেছেন তা পাঠকের জন্য তুলে ধরছি—
“কোরবানিকারীর জন্য কোরবানির পশু নিয়ে কনটেন্ট তৈরির দুটি খারাপ দিক আছে।
এক. প্রদর্শনীর কারণে নিয়ত ত্রুটিযুক্ত হয়ে কোরবানির মহত্ব নষ্ট হতে পারে।
দুই. যাদের মনিটাইজেশন চালু আছে, তাদের কোরবানির পশু নিয়ে বানানো ভিডিওর উপার্জন সদকা করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে, যা না দিলে কোরবানি ত্রুটিযুক্ত হয়ে যাবে। কারণ মাসআলার কিতাবে আছে, কোরবানির পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ নয়। যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি। সুতরাং কোরবানির পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দেবে।-মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০
বোঝা গেল কোরবানির পশুর ভিডিও থেকে উপার্জনও তা থেকে উপকৃত হওয়ার শামিল। অতএব এই উপার্জন যতদিন আসবে, যা আসবে সব সদকা করতে হবে, যা মনে রাখাও দুষ্কর।
তাই কেউ যদি কোরবানির পশুর ভিডিও এমন কোনো সাইটে আপলোড করে, যেখান থেকে উপার্জন হয়, তাদের উচিত তা ডিলিট করে দেওয়া।”
একই বিষয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরের জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল আমান আদাবরের ফতোয়া বিভাগের মুশরিফ মুফতি ফেরদাউস আল মামুনের কাছে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেছেন,
কোরবানিকারীর জন্য কোরবানির পশু নিয়ে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমেই ইখলাস বা বিশুদ্ধ নিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মনে হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষের প্রশংসা, লাইক-কমেন্ট কিংবা সামাজিক পরিচিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অথচ কোরবানির মূল শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ ও গোপন আন্তরিকতা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
সেই সঙ্গে যারা ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্যান্য মনিটাইজড প্ল্যাটফর্মে কোরবানির পশুর ভিডিও আপলোড করে অর্থ উপার্জন করেন, তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি প্রশ্ন তৈরি হয়। কারণ ভিডিও আপলোড করে অর্থ উপার্জন করার বিষয়ে এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হল তা নাজায়েজ। কেননা আয়টা আসে অ্যাডসেন্স থেকে। আর অ্যাড তৈরিতে শরীয়তের বিধিবিধান অনুসরণ করা হয় না। নাজায়েজ পণ্য ও হারাম বস্তু প্রচারের জন্য অনেক ক্ষেত্রে অ্যাড তৈরি করা হয়। অনেক সময় মূল পণ্যটি হালাল হলেও অ্যাডের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে নাজায়েজ উপাদান থাকে। অগত্যা যদি কেউ ভিডিওর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে ফেলে তাহলে তার জন্য তা দান করে দেওয়া আবশ্যক।
এ দুই তরুণ ইসলামিক স্কলারের ভাষ্য, ফিকহি কিতাবের মূলনীতি প্রমাণ করে যে, কোরবানির পশুকে কেন্দ্র করে ভিডিও বানিয়ে আর্থিক লাভ অর্জন করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ভিডিও থেকে দীর্ঘদিন ধরে আয় আসতে পারে, তাই সেই উপার্জনের হিসাব রাখা ও নিয়মিত সদকা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।
কোরবানির জন্য পশু নির্ধারণ করার পর তা থেকে ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হওয়া জায়েজ নয়। যেমন, সেই পশু দিয়ে হালচাষ করা, বাহন হিসেবে ব্যবহার করা, পশম কেটে বিক্রি করা ইত্যাদি নিষিদ্ধ। তেমনি তা দিয়ে ভিডিও করে অর্থ উপার্জনও নিষিদ্ধ। যদি কেউ করে তাহলে সমপরিমাণ অর্থ সদকা করা আবশ্যক।
ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, ‘কোরবানির পশু নির্ধারণের পর তা থেকে উপকার গ্রহণ করা বৈধ নয়।’ (কাযীখান, ৩/৩৫৪; আলমগীরী, ৫/৩০০)
হাদিস ও ফিকহের ব্যাখ্যাগ্রন্থেও এ
বিষয়ে আলোচনা এসেছে।
(মুসনাদে আহমদ, ২/১৪৬; নায়লুল
আওতার, ৩/১৭২; ইলাউস সুনান, ১৭/২৭৭)
এ কারণেই সচেতন আলেমরা পরামর্শ দেন, কোরবানির পশুকে প্রদর্শনীর বস্তু না বানানোই উত্তম। বিশেষত এমন কোনো প্ল্যাটফর্মে ভিডিও আপলোড করা থেকে বিরত থাকা উচিত, যেখানে তা থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে আপলোড করা থাকলে সেটি সরিয়ে ফেলাও অধিক সতর্কতা ও তাকওয়ার পরিচায়ক হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, কোরবানি আল্লাহর জন্য। এর সৌন্দর্য নির্ভর করে নিয়তের বিশুদ্ধতা ও সুন্নাহর অনুসরণের ওপর, প্রচার-প্রদর্শনের ওপর নয়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করার তাওফিক দান করুন।






