তীব্র ক্ষোভ-বঞ্চনা নিয়ে বিএনপি ছাড়ছেন ইসহাক সরকার
- এনসিপিতে যোগদান বিকেলে
- হচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক

ইসহাক সরকার
তীব্র ক্ষোভ, অভিমান ও বঞ্চনা নিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপি ছাড়ছেন পুরান ঢাকার জনপ্রিয় নেতা ইসহাক সরকার, যেটি ছিল তার প্রাণপ্রিয় সংগঠন। বিএনপি ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি)।
বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের দুই থেকে তিন হাজার নেতাকর্মী নিয়ে আজ শুক্রবার নাম লেখাবেন জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন এই রাজনৈতিক দলটিতে। বিকেল ৩টায় রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে হবে তার এই যোগদান অনুষ্ঠান। সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ইসহাক সরকারকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি।
ইসহাক সরকার বিএনপির রাজনীতিতে নতুন কেউ নন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ত্রিশ বছরের ওপরে। পুরান ঢাকায় বর্তমানে হাতেগোনা যে কয়জন নেতাকে ঘিরে বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত, ইসহাক সরকার তাদের অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক একটি সাংগঠনিক বলয় রয়েছে তার।
ছাত্রদলের তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় ইসহাক সরকারের। সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। একপর্যায়ে হন বিএনপির সহযোগী এই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী যুবদলেও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মামলা, বেশি জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার এবং গ্রেপ্তার হয়ে বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন, তাদের মধ্যে পুরান ঢাকার ইসহাক সরকার অন্যতম। জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ৩৬৬টি মামলা ছিল। বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ১০ বছর কারাগারে ছিলেন তিনি। ৫টি মামলায় তার ২২ বছর সাজাও হয়েছিল। এ ছাড়া ৫দিন গুমও ছিলেন তিনি।
নিজের ওপর হওয়া নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইসহাক সরকার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমার রিমান্ড খাটার যেন শেষ ছিল না। একটানা সাড়ে তিন বছর কারাগারে থাকাকালীন বিভিন্ন থানায় প্রায় ৩০ দিনের মতো টানা রিমান্ডে ছিলাম।’
আওয়ামী সরকারের এত নির্যাতন-নিপীড়ন সত্ত্বেও শহীদ জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপির সঙ্গেই ছিলেন ইসহাক সরকার। প্রত্যাশা ছিল, দল তার ত্যাগের মূল্যায়ন করবে। যার শুরুটা হবে জাতীয় নির্বাচনে মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন থেকে বিএনপির অন্যতম মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। এ জন্য দলের কাছে ধরনা দিয়েছেন, কিন্তু পাত্তা পাননি কোনো।
ইসহাক সরকারের ভাষ্য, এই আসনে দল থেকে এমন একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, যাকে গত ১৬-১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে কোথাও দেখা যায়নি।
ঢাকা-৭ আসনে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হামিদুর রহমান হামিদকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তখন মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, মোশাররফ হোসেন খোকন, প্রয়াত নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর পরিবারের লোকজনসহ মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সবাই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছিলেন। এমনকি পার্টি অফিসে হামিদের বিরুদ্ধে চিঠিও দিয়েছিলেন তারা। মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথে পালন করেছিলেন বিভিন্ন কর্মসূচিও। পরবর্তীতে দলের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে কর্মসূচি পরিহার করে হামিদের পক্ষে অবস্থান নেন তারা।
অবশ্য কর্মী-সমর্থকদের অনুরোধে ইসহাক সরকার থেকে যান নির্বাচনে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি; তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটও পান।
তবে অতীতের নানা ত্যাগ বিবেচনায় নির্বাচনের পরেও দল থেকে ডাক পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল ইসহাক সরকারের। এ জন্য তিনি অপেক্ষায়ও ছিলেন। কিন্তু সেই ধরনের কোনো ডাক গত দুই মাসেও পাননি। তাই ক্ষোভ, অভিমান ও বঞ্চনা নিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপি ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন পুরান ঢাকার এই নেতা।
যোগদানের পর তাকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির আহ্বায়ক করা হবে বলে জানান ইসহাক সরকার। তার দাবি, তিনি এনসিপিতে যোগদানের পর বিএনপির পদধারী অনেক নেতা পর্যায়ক্রমে চলে আসবে। তাদের মধ্যে পুরান ঢাকা, পল্টন, মতিঝিল এলাকার নেতারা থাকবেন।
এনসিপির নীতি-আদর্শ ভালো লাগা এবং জনগণের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকায় দলটিতে যোগদান করতে যাচ্ছেন ইসহাক সরকার। তিনি উল্লেখ করেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এনসিপির বর্তমান নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থান না হলে আমরা মুক্তি পেতাম না। হয় কারাগারে থাকতে হতো, না হলে ফাঁসির কাষ্ঠে যেতে হতো। তা ছাড়া জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য এনসিপির নেতারা বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাই আমি এই দলে যোগদান করছি।’
তার অভিযোগ, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে মানুষের সেবা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া তার অফিস দখল করে নেওয়া হয়েছে, আরও নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে।'
জানা গেছে, ইসহাক সরকার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির আহ্বায়ক হতে যাওয়ায় সরে দাঁড়াচ্ছেন বর্তমানে এই পদে থাকা দলের যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ।
ইসহাক সরকারের এনসিপিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে বিশেষ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণে দলটি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক একটি সাংগঠনিক বলয় রয়েছে তার।

