অনেক প্রস্তাব ছিল এমপি হওয়ার, তবে ভোটে জিতেই সংসদে যেতে চাই
- জামায়াত-এনসিপি জোট নিয়ে আমার অবস্থান অপরিবর্তিত
- জোটের বাইরে থাকলেও আমি সব সময় কাজ করব এনসিপির জন্য
- সংসদীয় সাফল্যই এনসিপির চূড়ান্ত ফল নয়
- গণপরিষদ নির্বাচন ছাড়া সম্ভব নয় টেকসই সংস্কার

সামান্তা শারমিন। ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সামান্তা শারমিন। আন্দোলনের সেই অভিজ্ঞতা থেকে পরে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটি ও জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যুক্ত ছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে। তবে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জোট-রাজনীতির প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার পরই তিনি রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে সরে যান কিছুটা আড়ালে। তার এই নীরবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— সামান্তা কি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন? রাজনীতির এই আলোচিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আগামীর সময়-এর পক্ষ থেকে তার সঙ্গে হয়েছে একান্ত আলাপ। সেখানে উঠে এসেছে তার অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমজাদ হোসেন হৃদয়।
আগামীর সময় : এনসিপি নিয়ে আপনার বর্তমান অবস্থান কী? সক্রিয় কার্যক্রমে ফিরবেন কি না?
সামান্তা শারমিন : এনসিপি আমাদের হাতে গড়া দল। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রতি রয়েছে একটা মায়া, দরদ ও আকাঙ্ক্ষা।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় মতবিরোধ বা আদর্শগত সংগ্রাম থাকতেই পারে— আমি এটাকে স্বাভাবিকভাবেই দেখি, এতে হতাশ নই আমি।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় মতবিরোধ বা আদর্শগত সংগ্রাম থাকতেই পারে— আমি এটাকে স্বাভাবিকভাবেই দেখি, এতে হতাশ নই আমি। আগেই বলেছিলাম, নির্বাচনের সময় আমি সক্রিয় থাকব না। ফলে এ সময়টায় আমাকে দৃশ্যমানভাবে দেখা যায়নি, সেটিই স্বাভাবিক। এখন দেখছি, এনসিপি একটি ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করছে নতুন এক ধাপে। এ পর্যায়ে আমি আবার সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের চেষ্টা করব এবং রাখব অবদান।
আগামীর সময় : নির্বাচন থেকে এখন পর্যন্ত সময়টা কীভাবে কেটেছে? আপনি কি রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন?
সামান্তা শারমিন : আমি কখনোই রাজনীতির বাইরে ছিলাম না। ভবিষ্যতে ইনশা আল্লাহ থাকব রাজনীতিতেই। একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন ধাপ থাকে— এই নির্বাচনী সময়টা আমার জন্য ছিল পর্যবেক্ষণের।
দীর্ঘ সময় সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় যাদের সঙ্গে আগে কথা বলা হয়নি— দলীয় ও দলবহির্ভূত বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বলেছি কথা। তাদের কাছ থেকে জেনেছি এনসিপির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার করণীয় কী হওয়া উচিত এবং তারা কীভাবে দেখছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
আমি দূর থেকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছি, চেষ্টা করেছি দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা ও ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক বোঝার। একই সঙ্গে, দীর্ঘ সময় সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় যাদের সঙ্গে আগে কথা বলা হয়নি— দলীয় ও দলবহির্ভূত বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বলেছি কথা। তাদের কাছ থেকে জেনেছি এনসিপির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার করণীয় কী হওয়া উচিত এবং তারা কীভাবে দেখছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। সময়টা আমার কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইন্টারেস্টিং।
আগামীর সময় : জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে আপনার অবস্থান কি এখনো আগের মতোই আছে?
সামান্তা শারমিন : আমি সব সময় চেষ্টা করি আমার রাজনৈতিক অবস্থানে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। হঠাৎ সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেওয়ার মতো বক্তব্য আমি দেই না। জোটকালীন আমি যে অবস্থান নিয়েছিলাম, এখনো সেটির পাশে আছি। তবে কোনো অবস্থান সঠিক না ভুল— এটি নির্ধারণ করবে ইতিহাস। সময়ই দেখাবে এ সিদ্ধান্তগুলো কতটা কার্যকর ছিল এনসিপির জন্য।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি খুবই জটিল। এখানে অনেক দল নিজের আদর্শে জনগণকে আকৃষ্ট করতে না পেরে যায় নানা সমঝোতায়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি খুবই জটিল। এখানে অনেক দল নিজের আদর্শে জনগণকে আকৃষ্ট করতে না পেরে যায় নানা সমঝোতায়। অতীতে আমরা দেখেছি, আদর্শগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দল জোট করেছে নির্বাচনের সময়। এ বাস্তবতায় জামায়াত অনেক সময় কাজ করেছে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে। কিন্তু এনসিপি এখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করার অবস্থানে আছে— এটিই গুরুত্বপূর্ণ।
আগামীর সময় : ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে জোটভুক্ত কোনো কার্যক্রমে আপনি অংশ নেবেন?
সামান্তা শারমিন : আমি এনসিপিকে বিশ্বাস করি এবং এনসিপির জন্য কাজ করতে সব সময় প্রস্তুত। কিন্তু জোটভিত্তিক কার্যক্রমে আমাকে হয়তো দেখা যাবে না। তবে এনসিপির যেকোনো প্রয়োজনে, বিশেষ করে সংকট বা দুঃসময়ে— আমি অবশ্যই থাকব পাশে।
আগামীর সময় : নির্বাচন ও জোটসহ নানা ইস্যুতে এনসিপি কি সঠিক পথে আছে?
সামান্তা শারমিন : এনসিপির ম্যানিফেস্টো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে— এখানে দুটি ধারা কাজ করছে একসঙ্গে। একদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি বিশ্বাস, অন্যদিকে বিপ্লবকেও গণতন্ত্রের বাইরে কিছু হিসেবে দেখা হয় না। এই দুই ধারাকে সমন্বয় করার জন্য আমরা গণপরিষদ নির্বাচনের কথা বলেছি। আমি মনে করি, টেকসই পরিবর্তনের জন্য গণপরিষদ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি।
পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোতে যে আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা থাকা উচিত, তা আমি দেখতে পাই না। এনসিপির সামনে নতুন করে গড়ে ওঠার সুযোগ আছে— এটিই আমাদের শক্তি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বরং বেড়েছে এনসিপির প্রয়োজনীয়তা। পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোতে যে আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা থাকা উচিত, তা আমি দেখতে পাই না। এনসিপির সামনে নতুন করে গড়ে ওঠার সুযোগ আছে— এটিই আমাদের শক্তি। তবে আমি মনে করি, সংসদকেন্দ্রিক সাফল্যকে এনসিপির চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এনসিপির যে মূল আকাঙ্ক্ষা, তা অর্জনের জন্য আমাদের আরও সময় লাগবে।
আগামীর সময় : সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে আপনাকে ঘিরে আলোচনা ছিল— আপনি কি কোনো প্রস্তাব পেয়েছিলেন?
সামান্তা শারমিন : হ্যাঁ, শুধু এনসিপি নয়—বিভিন্ন দল থেকেই প্রস্তাব পেয়েছি। এটা সম্ভবত নারী নেতৃত্বের সংকটেরই প্রতিফলন। আমি সংরক্ষিত নারী আসনকে একধরনের ‘অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন’ হিসেবে দেখি, তবে এটিকে একই সঙ্গে একটি অপমানজনক প্রথা বলে মনে করি। যতদিন এটি প্রয়োজন, ততদিন এটি আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি কালো অধ্যায় হিসেবেই থাকবে।
যদি কখনো সংসদে যাই, তাহলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েই যেতে চাই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি নির্বাচনের পক্ষে। যদি কখনো সংসদে যাই, তাহলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েই যেতে চাই।
আগামীর সময় : নির্বাচিত সরকার জুলাই ও সংস্কারকে কতটা ধারণ করছে?
সামান্তা শারমিন : আমার মনে হয়, সরকার প্রকৃত অর্থে ধারণ করতে পারেনি জুলাইয়ের চেতনা; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে করা হয়েছে ব্যবহার।
জুলাইয়ের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা বিভিন্ন দল কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের স্বার্থে।
জুলাইয়ের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা বিভিন্ন দল কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের স্বার্থে। কিন্তু সংস্কার প্রশ্নে এখনো ভীতি কাজ করছে— বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। আমি আগেও বলেছি, সংস্কারকে অনেকেই দেখে ‘ভয়ের বিষয়’ হিসেবে। এ মানসিকতা থেকে বের হতে পারলে বড় পরিবর্তন আসতে পারত রাজনীতিতে।
আগামীর সময় : বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম ও রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয় কী?
সামান্তা শারমিন : প্রথমত, অল্প কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে এনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে জনমনে। যেমন— গণপরিষদ নির্বাচন ছাড়া কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন স্থায়ী করা সম্ভব নয়— এ বিষয়টি ছড়িয়ে দিতে হবে মানুষের মধ্যে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি।
বর্তমানে অনেক দল গণতান্ত্রিক চর্চা করে না; বরং পরিচালিত হয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে।
বর্তমানে অনেক দল গণতান্ত্রিক চর্চা করে না; বরং পরিচালিত হয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে। এ সংস্কৃতি বদলাতে হলে আনতে হবে ভেতর থেকে পরিবর্তন। মাঠপর্যায়ে তৈরি করতে হবে সচেতন ও নিবেদিত কর্মী। মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আনতে পারলেই সম্ভব টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন।
এই ভিত্তি তৈরি করা এনসিপির কাজ হওয়া উচিত। এর বাইরে কোনো বিকল্প নেই।
আগামীর সময় : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
সামান্তা শারমিন : আপনাকেও ধন্যবাদ। সেই সঙ্গে আগামীর সময়ের জন্য শুভকামনা।



