বঙ্গবন্ধুর অবদান স্বীকার ও তার শাসনামলের নির্মোহ মূল্যায়ন জরুরি : সিপিবি

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৫১তম বার্ষিকীর আলোচনা সভায়সিপিবি নেতৃবৃন্দ
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। একই সঙ্গে তার স্বাধীনতা পরবর্তী শাসনামলের নির্মোহ ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করাও জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নেতৃবৃন্দ।
আজ শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে মুক্তি ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৫১তম বার্ষিকীর আলোচনা সভায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক এম এম আকাশ, ডা. দিবালোক সিংহ ও মঞ্জুর মঈন।
সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল নেতৃত্বের। পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ঐতিহাসিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির দুটি ধারা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান শক্তি।
তারা বলেন, জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জাতীয়তাবাদী ধারার প্রধান ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হন। ৬ দফা, পরবর্তীতে ১১ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রোথিত হয়। এর প্রেক্ষিতে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে।
একজন সম্মোহনী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিসহ প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক শক্তিসমূহ যার যার অবস্থান থেকে সর্বাত্মক সংগ্রাম ও অসীম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে।
আলোচনা সভায় সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে তার দলের শ্রেণি অবস্থানের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করার সুযোগ কখনোই ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তার শাসনামলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ের সেই মোহ ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে।
তাদের ভাষ্য, সদ্য স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাষ্ট্রক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক রূপান্তর, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি এবং জনজীবনের নানা সমস্যার কারণে দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। একই সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রও তীব্র হয়ে ওঠে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর যে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন নীতিগত বিচ্যুতি, রাজনৈতিক সংকট এবং আওয়ামী লীগের একটি অংশের চরমপন্থী অবস্থানে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রগতির ধারা অঙ্কুরেই প্রতিবিপ্লবী প্রবণতার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচনের প্রবণতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে তারা মন্তব্য করেন।
সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, ওই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেই একটি প্রতিক্রিয়াশীল পটপরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো এবং নিহতদের স্মরণ করা ঐতিহাসিক কারণেই জরুরি উল্লেখ করে তারা বলেন, সিপিবি সে সময়েও এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং আজও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান অব্যাহত রেখেছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ইতিহাসকে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সম্পত্তিতে পরিণত করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তী তার শাসনামলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতন্ত্রের সংকোচনের ঘটনাবলিরও নির্মোহ মূল্যায়ন করতে হবে। ইতিহাসের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকলেই অতীতের রাজনৈতিক ভুল ও বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।
১৯৭৫ ও ২০২৪-এর সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি
সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ, স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের যে ধারার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতিটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে প্রকাশ্য ও নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তারা। তাদের মতে, ১৯৭৫ ও ২০২৪-সহ সকল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দায়ীদের বিচার এবং প্রকাশ্য ও নেপথ্যের সকল শক্তিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
আলোচনা সভা থেকে সিপিবি নেতৃবৃন্দ ইতিহাসের বিকৃতি ও দলীয় রাজনৈতিক বয়ানের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো অধরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে সবাইকে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তারা শাসকগোষ্ঠীর জুলুম, সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র ডানপন্থা, নারী বিদ্বেষ, মৌলবাদ এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।








