একের পর এক বিতর্কে জাকসু ভিপি জিতু

জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ভর্তির পর ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত। ২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে যুক্ত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে, হন সমন্বয়ক; নেতৃত্ব দেন আন্দোলনের। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে ভিপি নির্বাচিত হন। শিবির সমর্থিত জোটের জয়জয়কারের মধ্যে আব্দুর রশিদ জিতুর এই বিজয় সে সময় দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
ছাত্রলীগ থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হয়ে বিএনপিতে যুক্ত হওয়া এই ছাত্রনেতা নতুন করে এসেছেন আলোচনায়। অবশ্য এবার তাকে নিয়ে হচ্ছে সমালোচনা। অটোরিকশা অনুমোদনে চাঁদাবাজি, ছাত্রত্ব শেষ হলেও হলে অবস্থান, ছাত্রলীগ কর্মীদের আশ্রয়, ব্যবসায়ীদের বকেয়া না মেটানো এবং শিক্ষকদের সামনেই ছাত্রনেতাদের গালাগালসহ নানা অভিযোগের তীর একসময়ের জনপ্রিয় এই ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে।
ছাত্রলীগ কর্মীদের ছত্রছায়া দেওয়া: গত বুধবার আল-বেরুনী হলে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক হন মেহেদী হাসান আবীর নামের এক শিক্ষার্থী। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করতে চান ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, জিতুর হস্তক্ষেপে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আবীর ছাত্রলীগের ফেসবুক পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে জিতু তাকে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
যেহেতু জিতুর ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা ছিল, তাই তার অনুসারীদের বড় অংশই সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। যারা তার আশ্রয়েই ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে আব্দুর রশিদ জিতু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে জড়িত ছিলেন না।
শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই গালাগাল: একই দিনে ‘ফ্যাসিস্ট পতন দিবস’ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত এক প্রীতিভোজে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনার সময় শিক্ষকদের সামনেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন জিতু। অভিযোগ উঠেছে, তিনি জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আহসান লাবিব, জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবু তৌহিদ সিয়াম এবং ছাত্রদলের নেতা হামিদুল্লাহ সালমানকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছেন। এতে ক্যাম্পাসে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে পরে জিতুর দাবি তিনি কোনো ছাত্রনেতাকে লক্ষ করে গালাগাল করেননি; তার মন্তব্য ছিল তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকদের উদ্দেশে।
অটোরিকশা অনুমোদনে চাঁদাবাজি: বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবান্ধব অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি পাইয়ে দেওয়ার নামে চালকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে জাকসু ভিপির বিরুদ্ধে। গত ২৩ জুলাই এ-সংক্রান্ত একটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়, যেখানে এক কর্মচারী ও চালকের কথোপকথনে জিতুর নাম উঠে আসে। এ ছাড়া রিকশার বেশ কিছু আবেদনপত্রে ‘জিতু/জাকসু’ রেফারেন্স হিসেবে লেখা থাকার প্রমাণ মেলে।
তবে জিতুর দাবি, তিনি শুধু অল্প কয়েকটি রিকশার লাইসেন্সের জন্য সুপারিশ করেছিলেন মাত্র। তার নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদাবাজি বা টাকা আদায় করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ লঙ্ঘন: ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও ছয় মাস হলে থাকছেন ভিপি জিতু। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্রছাত্রীদের শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ-২০১৮’-এর ৫(ট) ধারায় বলা হয়েছে, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে নিজ নিজ আবাসিক হল ত্যাগ করতে হবে।
তবে হঠাৎ করেই প্রশাসন একটি আদেশ জারি করে। যেখানে বলা হয়, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও নির্বাচিত জাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিরা পদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হলে থাকার সুযোগ পাবেন। এর ফলে জিতুর হলে অবস্থার বৈধতা পায়। অভিযোগ উঠেছে, জিতুকে সুবিধা দিতেই এই আদেশ।
হোটেল ও চায়ের দোকানে বিনামূল্যে খাওয়ার অভিযোগ: ক্যাম্পাসের একাধিক ব্যবসায়ী জাকসু ভিপির বিরুদ্ধে বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগ করেছেন। আল-বেরুনী হলসংলগ্ন এক চা-দোকানির দাবি, জিতুর কাছে তার প্রায় ২৬ হাজার টাকা বকেয়া পড়ে আছে। বটতলা এলাকার বেশ কয়েকটি খাবারের হোটেলের মালিকও একই ধরনের বাকি খাওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
একের পর এক ঘটনা ও বিতর্কের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও উঠেছে।
নিন্দা জানিয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দিন বাবর বললেন, ‘আমরা ছাত্রলীগ প্রশ্নে সবাই এক ও অভিন্ন। কেউ যদি ছাত্রলীগকে প্রশ্রয় দেয়, সেটি হবে ন্যক্কারজনক কাজ। জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাসে আবারও বাকি, চাঁদাবাজি ও গালাগাল করলে শিক্ষার্থীরা এটিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ ও বিনামূল্যে খাবারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার আব্দুর রশিদ জিতুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. জাকির হোসেনের সঙ্গেও। তিনি বললেন, ‘আমিও এই বিষয়গুলো জেনেছি। আমি দায়িত্ব নিয়েছি দু-তিন দিন হয়েছে। জুলাইয়ের প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এসব বিষয়ে কনসেনট্রেট করতে পারছি না।’




