গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত চায় জামায়াত

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। ছবি: আগামীর সময়
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় গাজীপুরে নিহত হন তৌফিক শেখ (২২)। এ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা ও নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি দলটির।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব দাবি জানান।
এর আগে গত সোমবার গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নেন তৌফিক (২২)।
ওই দিন গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সেই সময় তৌফিকসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। পরে তাদের গাজীপুরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের এ প্রসঙ্গই মূলত গুরুত্ব পেয়েছে বিরোধী দল জামায়াতের জরুরি সংবাদ সম্মেলনে। এতে দাবি জানানো হয়, শ্রমিকদের কল্যাণে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার।
শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বললেন, কেন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং কারা দায়ী, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।
‘পাশাপাশি আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
মজুরি নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে যে অসন্তোষ বিরাজ করছে তা নিয়ে জামায়াত উদ্বিগ্ন বলেও জানালেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল। বললেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘটনায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
‘বর্তমান পরিস্থিতি শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধ নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় সংকট’, উল্লেখ করেন তিনি।
সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বললেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ সেই তুলনায় তাদের আয় ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার।
মজুরি বোর্ডকে অবশ্যই বর্তমান বাজারের কথা বিবেচনায় নিয়ে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। ‘সরকার গঠিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বর্তমান বাজারদর ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দিতে হবে’, যোগ করেন জামায়াতের এ নেতা।
দ্রুত মজুরি ঘোষণা দেওয়ার দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।
আন্দোলনের মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নাশকতার নিন্দা জানিয়েছে জামায়াত। দলের এ নেতা বললেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা এক বিষয় নয়। কারখানা ধ্বংস হলে শ্রমিক কর্মসংস্থান হারান, মালিক বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।
শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর উসকানি রয়েছে কিনা তা তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতের এ নেতা। বললেন, ‘চলমান পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ কোনো মহল উসকানি বা নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি। তবে প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী করা যাবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নিরপরাধ গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তি, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, বন্ধ কারখানা চালু, কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের পুনরায় কাজের সুযোগ এবং শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা।
এ ছাড়া সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজন, শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বললেন, শ্রমিক ও মালিককে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, নূরুল ইসলাম বুলবুল, মো. সেলিম উদ্দিন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান প্রমুখ ছিলেন।





