রাজপথ ছেড়ে কাজে ফিরেছেন সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা

গাজীপুরে আজ সকালে কাজে যোগ দিতে কারখানায় যাচ্ছেন পোশাকশ্রমিকরা। ছবি: আগামীর সময়
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে টানা কয়েক দিনের শ্রমিক বিক্ষোভের পর কাজে ফিরেছেন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের পোশাকশ্রমিকরা।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত গাজীপুরের কোনো মহাসড়ক বা আঞ্চলিক সড়কে শ্রমিকদের অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। সকালে নিজ নিজ কর্মস্থলে প্রবেশ করতে দেখা গেছে শ্রমিকদের।
এদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পোশাক কারখানাসহ শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি সদরদপ্তর।
বৃহস্পতিবার বিজিবি সদরদপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাইন জানান, গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজও মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৮ প্লাটুন এসআরবি রয়েছে।
আরিফ জানিয়েছেন, আন্দোলনের নামে যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, মানুষের জানমালের কোনো ক্ষতি না হয়, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। ইতিমধ্যে বিজিবি সদস্যরা মাঠে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রস্তুত রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে সাভারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—উলাইল, রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, বাইপাইল ও কাঠগড়া এলাকার কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক পরিবেশেই শ্রমিকরা প্রবেশ করেন। সকাল ৮টা থেকে কারখানাগুলোতে পুরোদমে উৎপাদন কাজ শুরু হয়।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকায়। সেখানকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকালে কারখানায় প্রবেশ করে হাজিরা দেওয়ার পরপরই আবার বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তারা আরও কয়েকটি কারখানার ফটকে গিয়ে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
ছুটি ঘোষণার পর কয়েক শতাধিক শ্রমিক বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে নেমে মিছিলের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দ্রুত তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে।
শিল্প এলাকায় যেন নতুন করে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সে জন্য কারখানার ফটক ও প্রধান প্রধান সড়ক মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, পোশাক শ্রমিকরা সকাল থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। সার্বিকভাবে শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
শিল্পাঞ্চল সাভারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ পোশাক কারখানাতেই কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে এবং শ্রমিকরা নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে গুটিকয়েক কারখানায় বিশৃঙ্খলার জেরে শ্রমিকদের উপস্থিতির পর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো শিল্পাঞ্চলজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মজুরির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে সহিংসতা যেন না ঘটে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নারায়ণগঞ্জে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বলয় তৈরি করেছে প্রশাসন।
সকাল থেকে ফতুল্লার শিল্প এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ, বিজিবি এসআরবি সদস্যরা অবস্থান নিয়েছে। শ্রমিকরা স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিদিনের ন্যায় কাজে যোগ দিয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মাসুদ জানিয়েছেন, শ্রমিকদের সঙ্গে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে তা মাথায় রেখে আজ অতিরিক্ত পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও এসআরবি সহ বিজিবি মোতায়েন করায় ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ রোডে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ বক্স, পুলিশের গাড়ি ও কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। কয়েক দফায় শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হন। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে গাজীপুরে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। এ ছাড়া আন্দোলন চলাকালে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের সময় শ্রমিকদের মারধরের শিকার হয়ে মো. তৌফিক নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
তিন দফা দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল বুধবার পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। একই দিন সংঘর্ষে পুলিশ ও দুই সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।





