ইন্দিরা আর মোদি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

সংগৃহীত ছবি
একদা কলকাতার জনসমুদ্রে ঠাসা ব্রিগেড ময়দানে কুঁচিহীন লাল পাড় গরদের শাড়ি পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। পোশাকের সেই অনাড়ম্বর অথচ শক্তিশালী প্রকাশ যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছিল, দীর্ঘ সময় পর তেমন এক আবহাওয়া ফিরে এসেছে আবারও।
পোশাকের এই লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই নরেন্দ্র মোদিও। তার পরনে কুঁচকানো ধুতি। মুখে ‘পরিবর্তনের’ ডাক। বুঝিয়ে দিলেন তার ‘বার্তা’ আসলে বেশভূষাই। যদিও তার উচ্চারণে অভাব ছিল আত্মবিশ্বাসের। তবে পশ্চিমবঙ্গের এই বদল একাত্তরের মতো অতটা নাটকীয় নয়। অবশ্য উভয় ক্ষেত্রেই স্বনির্মিত এই প্রতাপশালী নেতারা বিশ্বকে এটিই বুঝিয়ে দিয়েছেন— তারা কেবল তাদের আরাধ্য দেবতার চরণেই মাথা নত করেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আনন্দমঠে ‘বন্দে মাতরম’ গানের মাধ্যমে বঙ্গমাতাকে এই মর্যাদা দিয়েছিলেন। এটি বিতর্ককে আরও উসকে দেয়— গানটি সম্রাটকে সম্মান জানায় নাকি সর্বশক্তিমানকে
উল্লাস আর আক্ষেপের এই দোলাচলে দুটি ছবি আজ একে অপরের ওপর চেপে বসেছে। যার কেন্দ্রে এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ‘ভারত মাতা’ কেবল ১৯০৫ সালে অস্থির ভারতকে একজন দেবীই উপহার দেয়নি, বরং ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই তাকে আজকের ফ্যাশনেবল গেরুয়া বসনে সাজিয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে, অবনীন্দ্রনাথের পেইন্টিংয়ের কয়েক দশক আগেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আনন্দমঠে ‘বন্দে মাতরম’ গানের মাধ্যমে বঙ্গমাতাকে এই মর্যাদা দিয়েছিলেন। এটি বিতর্ককে আরও উসকে দেয়— গানটি সম্রাটকে সম্মান জানায় নাকি সর্বশক্তিমানকে? বিশ্লেষকরা অবশ্য মা ও মেয়ের এই নারীত্বের বন্দনাকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেন না।
ধর্ম বাণিজ্যের এই বিশাল প্রসারে দুই নারী দেবতার উপস্থিতি সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পবিত্রতার ভান করা প্রায় আড়াই হাজারের বেশি সংস্থা রয়েছে। গেরুয়া তিলক, ‘হর হর মোদি’ আর ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনির আড়ালে উভয়পক্ষেই খুনি আর লক্ষ্যভেদিদের আনাগোনা। এর মধ্যে শুভেন্দু অধিকারীর সহকারীর মতো ব্যক্তিদের যারা হত্যা করেছে, সেই অপরাধীদের ক্ষুধা মেটানোই এখন রাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।
রাজ নারাইন একবার পরিহাস করে বলেছিলেন, ‘টাই ছুড়ে ফেলে লেংটি পরুন, নয়তো ভারতীয় সংস্কৃতি মরে যাবে’
অনিশ্চয়তার এই পরিবেশে কাউকে শাসন করা সহজ হবে না। যেখানে গতকালের খুনি আজ ভক্তের ছদ্মবেশে হাজির। গো-রক্ষকরা সদা প্রস্তুত থাকে সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। মোটরসাইকেল আরোহী দুঃসাহসীরা হেলমেট ছাড়াই ট্রাফিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। কারণ তারা জানে পার পেয়ে যাবে।
বিচার ব্যবস্থার এই দুর্বলতার কথা প্রথম শুনেছি ভ্যালেন্টাইনস ডে বিতর্কের সময়। তখন তিনটি প্রধান আপত্তি ছিল। প্রথমত, উৎসবটি পশ্চিমা হওয়ায় দেশপ্রেম পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রচারের কারণে এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষতি করছে। তৃতীয়ত, পুঁজিপতিরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর বাইরে ‘হিন্দু মুন্নানি’র মতো সংস্থাগুলো বলেছিল— এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। রাজ নারাইন একবার পরিহাস করে বলেছিলেন, ‘টাই ছুড়ে ফেলে লেংটি পরুন, নয়তো ভারতীয় সংস্কৃতি মরে যাবে!’
এই যে সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে গ্রিনহাউস সুরক্ষার প্রয়োজন, এর স্বরূপ আসলে কী? এর উত্তর নিয়ে যায় এক গভীর উদ্বেগের দিকে। নতুন এই ব্যবস্থায় মানুষের জীবন কেমন হবে? প্রশ্নটি বিশেষ প্রাসঙ্গিক, কারণ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো মেলেনি।
ইসরায়েলের একটি পুরনো কৌতুক আছে। আরবরা বিশ্বাস করে নেসেটের দেয়ালে ঝোলানো ম্যাপটি আসলে ইহুদি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড বিস্তারের চূড়ান্ত মানচিত্র। বাস্তবে সেখানে তেমন কোনো ম্যাপ নেই। কিন্তু ইসরায়েলের দখল দেখে মনে হয় ম্যাপটি জায়নবাদীদের হৃদয়ে খোদাই করা
গতকালের তৃণমূলী দেশপ্রেমিকরা (সত্তরের দশকের ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লবীরা) আজ দ্রুত রঙ বদলাচ্ছেন। পারিপার্শ্বিক কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন ছাড়া এত বড় রাজনৈতিক রূপান্তর সম্ভব নয়। অনেকে মজা করে বলছেন, মাছের থালাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে বাংলার নির্বাচন। ইসরায়েলের একটি পুরনো কৌতুক আছে। আরবরা বিশ্বাস করে নেসেটের দেয়ালে ঝোলানো ম্যাপটি আসলে ইহুদি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড বিস্তারের চূড়ান্ত মানচিত্র। বাস্তবে সেখানে তেমন কোনো ম্যাপ নেই। কিন্তু ইসরায়েলের ক্রমাগত ভূখণ্ড দখল দেখে মনে হয় সেই ম্যাপটি জায়নবাদীদের হৃদয়ে খোদাই করা আছে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও একই কথা। বাংলার ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ বা সীমিত করবে। এই সতর্কতা গেরুয়া শিবিরের কাছে হাস্যরসের খোরাক হয়েছিল। হিমাচল প্রদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ সিং ঠাকুর জনসমক্ষে মাছ-ভাত খেয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন বীরের এই দেশে খাদ্যাভ্যাসে কোনো বিধিনিষেধ নেই। অন্যরা মমতার দাবিকে ‘ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু আচরণ বদলে দেওয়ার অন্য সূক্ষ্ম পথও রয়েছে। ইভিএম মেশিন পাহারা দেওয়ার সময় এক জওয়ানকে দেখেছি যার পোশাকের ওপর ‘জয় ভগবান’ লেখা ট্যাগ ছিল। এটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও প্রশ্ন জাগে— কোন ভগবান?
জওহরলাল নেহরু এমন দৃশ্য দেখলে হয়তো রাগে ফেটে পড়তেন। ইন্দিরা গান্ধী হয়তো এড়িয়ে যেতেন
আমার এক সামরিক বন্ধু বুঝিয়ে বললেন, তিনি হয়তো নিয়মিত সেনাবাহিনীর কেউ নন। বরং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য যেখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে।
অন্য একটি দৃশ্যে দেখা যায় লোকসভায় ওজস্বী বক্তৃতার সময় অনুরাগ ঠাকুরের কপালে সিঁদুরের তিলক। এটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে গ্রহণযোগ্য। তবে একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দায়িত্ব পালনকালে এটি প্রদর্শন করেন, তখন তাতে কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের ইঙ্গিত থাকে।
জওহরলাল নেহরু এমন দৃশ্য দেখলে হয়তো রাগে ফেটে পড়তেন। ইন্দিরা গান্ধী হয়তো এড়িয়ে যেতেন। তৃণমূলের সঙ্গে ভোটারদের যে সাময়িক লেনদেনের সম্পর্ক ছিল, তাতে এ ধরনের রফাদফার সুযোগ ছিল।
হিন্দুত্ব আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্ম বা আদর্শ নয়। এখানে পাথরে খোদাই করা কোনো নিয়ম নেই। মন্দিরে মন্দিরে পূজা দেওয়া বা মোদির পাগড়ির ওপর মুকুট পরা— কোনোটিই নির্দিষ্ট উপাসনার রূপ নয়। রাজা রামমোহন রায়ের জন্য জাফরান তিলক ছিল প্রচলিত প্রথার বিরোধী। টেলিভিশনে এই জমায়েতগুলো ভক্তিভাবের চেয়ে সামাজিক মিলনমেলা হিসেবেই বেশি মনে হয়।
আমার কসাই বন্ধু বলে, বিজেপির উত্থান মানে চীনে গরুর মাংস রপ্তানি বেড়ে যাওয়া। ভোট চুরির অভিযোগ সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছে
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে ‘ধাম’ উপাধি দেওয়া নিয়ে ওড়িশার আপত্তি আসলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ছোটবেলায় একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাবে এক উপাসককে পুরোহিতের কাছে সরস্বতীর স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করতে শুনেছি। এটুকুই ছিল আমার শোনা সবচেয়ে ‘ধর্মতাত্ত্বিক’ আলাপ।
আমার কসাই বন্ধু বলে, বিজেপির উত্থান মানে চীনে গরুর মাংস রপ্তানি বেড়ে যাওয়া। ভোট চুরির অভিযোগ সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। কারণ বিজ্ঞাপনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মোহে। নারীদের মাসিক তিন হাজার টাকা, এক কোটি চাকরি এবং অঢেল বেকার ভাতার আশ্বাস।
হিন্দুত্ব আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্ম বা আদর্শ নয়। এখানে পাথরে খোদাই করা কোনো নিয়ম নেই। মন্দিরে মন্দিরে পূজা দেওয়া বা মোদির পাগড়ির ওপর মুকুট পরা— কোনোটিই নির্দিষ্ট উপাসনার রূপ নয়
তৃণমূলও একই রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কয়েক দশকের বামফ্রন্ট স্থবিরতার পর তারা কিছুটা কথা রেখেছিল। কিন্তু যখন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেল, নতুন পুঁজি এলো না, টাটার পর ইন্দোনেশিয়ার সালিম গ্রুপও চলে গেল এবং সেবার জায়গায় ঔদ্ধত্য চলে এলো— তখন কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি বেকারদের কর্মসংস্থানের অভাবকে নগ্ন করে দিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারার খেসারত দিয়েছেন, বিজেপিকেও একদিন দিতে হবে। যদি না তারা তাদের এই লেনদেনমূলক প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী আর নরেন্দ্র মোদি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
ভাষান্তর : সাইখ আল তমাল




