উপকারভোগীর জন্য ডেটাবেজ জরুরি

ড. ফাহমিদা খাতুন
একটি নতুন রাজনৈতিক সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিয়ে জনআকাঙ্ক্ষা থাকাটাই স্বাভাবিক। পাঁচ বছরের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার স্বভাবতই একটি বড় এবং সম্প্রসারণমূলক বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করছে। স্বল্পোন্নত ও বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে চাহিদার শেষ নেই, তাই বাজেটের আকার নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রশ্নটি যখন গুণগত বাস্তবায়নের এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার, তখন গভীর উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়। আমরা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে অনমনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এমন পরিস্থিতিতে যখন সরকার বাজারে বড় অঙ্কের অর্থব্যয়ের পরিকল্পনা করে, তখন মুদ্রাবাজারে টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থাকা সত্ত্বেও, সরকারের এই সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও উসকে দিতে পারে। আর এই মূল্যস্ফীতির মূল শিকার হন আমাদের নিম্নবিত্ত, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
এই সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতই একমাত্র বর্ম। বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি বা ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু আমাদের মূল দুর্বলতা সুশাসনের অভাব। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে প্রকৃত প্রাপকদের বাদ দিয়ে অযোগ্যরা এই তালিকার সুবিধাভোগী হয়ে ওঠেন। এই লক্ষ্যচ্যুত বরাদ্দ শেষ পর্যন্ত কোনো উৎপাদনশীল অবদান রাখে না, বরং অপচয় ও দুর্নীতির জন্ম দেয়। তাই একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ডিজিটাল এবং অটোমেটেড ডেটাবেজ তৈরি করে সরাসরি বেনিফিশিয়ারিদের কাছে অর্থ পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি।
অন্য বড় উদ্বেগটি হলো আমাদের রাজস্ব আদায়ের ব্যর্থতা এবং ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা। জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত এখনো আইএমএফের থ্রেশহোল্ডের নিচেই রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা। রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং রিজার্ভের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ এরই মধ্যেই ডেট সাসটেইনেবিলিটির ক্ষেত্রে ‘লো রিস্ক’ থেকে ‘মডারেট রিস্ক’ জোনে প্রবেশ করেছে। পরিশেষে আমি মনে করি, বাজেট বড় হওয়া বড় কথা নয়; এক টাকা বিনিয়োগ করে আমরা কতটুকু সুফল অর্থনীতিতে ফেরত পাচ্ছি এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে তা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছি— তা নিশ্চিত করাই হবে এ সরকারের আসল পরীক্ষা।




