দেশের গণতন্ত্র কার হাতে নিরাপদ

সন্তান-পুত্রবধূ ও নাতনির সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া - সংগৃহীত ফাইল ছবি
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হন এবং অসংখ্য মা-বোন সম্ভ্রম হারান। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও তার দলের নেতাদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে নানা মত থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা অস্বীকার করার মতো ছিল না। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর একপর্যায়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এবং মুজিবনগর সরকারের দায়িত্বে থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্ত নেতাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দূরে সরে যান। তাদের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন অন্যতম।
শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম প্রতিপক্ষ ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। সিরাজ শিকদার নিহত হওয়ার পর সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি উচ্চস্বরে বলেছিলেন, ‘কোথায় সিরাজ শিকদার?’
যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার গঠন করে তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেই ব্যবস্থার পথ থেকে সরে গিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বাকশাল গঠন করেন। দেশে একটি দল থাকবে এবং চারটি জাতীয় পত্রিকা থাকবে—এমন ব্যবস্থা চালু হয়। গণতন্ত্রকামী স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নিতে পারেননি। বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ তখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। তার নিকটাত্মীয়দের একটি অংশ লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। এর মধ্যেই ঘটে যায় ভয়াবহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি নিহত হন। খন্দকার মোশতাক আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ঘটনাবহুল দিনগুলো পেরিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সিপাহি-জনতার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা রহিত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন। সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের সুযোগও নিশ্চিত করেন।
তার আমলে শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসে রাজনীতি করার সুযোগ পান। ফিরে পান ব্যাংক ব্যালেন্স ও বাড়িঘর। দেশে অবাধ গণতন্ত্র, সর্বত্র শান্তির সুবাতাস, সবুজ বিপ্লব, খাদ্য উৎপাদন, গণশিক্ষা, গণতন্ত্রের চর্চা, ধর্মীয় চর্চা ও বাকস্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি হয়। দেশে-বিদেশে তার জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, মানুষের মনের মণিকোঠায় যখন তার স্থান, তখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে তিনি নিহত হন। নিভে যায় গণতন্ত্রের বাতি। অবসান ঘটে এক স্বর্ণালী যুগের। আমরা হারাই নির্লোভ, নিরহংকার ও সদালাপী স্বাধীনতার ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার, সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে।
দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করা এবং দেশকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ বন্দুকের নলের মুখে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ছন্দপতন ঘটে। গণতন্ত্র হারায় তার স্বকীয়তা; চলে যায় নির্বাসনে।
১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকার শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করলে বেগম খালেদা জিয়া কোনো শর্ত না মেনে নির্বাচন বর্জন করেন। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করে তিনি ইস্পাতকঠিন শপথ নিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। জেল, জুলুম ও হুলিয়া—কোনো কিছুই এরশাদ সরকারকে তার গতিপথ রুখতে পারেনি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো আপস না করায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’ ও গণতন্ত্রের অবিসংবাদিত নেত্রী।
অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। তিনি ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। এর মধ্যে ঝরে যায় অনেক প্রাণ। তাদের মধ্যে নূর হোসেন ছিলেন অন্যতম। তার পিঠে ও বুকে লেখা ছিল, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’।
নির্বাসনে পাঠানো গণতন্ত্র ফিরে আসে বাংলা মায়ের কোলে। সর্বসম্মতিক্রমে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। শুরু হয় সংসদীয় গণতন্ত্র। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। আবার শুরু হয় গণতন্ত্রের চর্চা।
বেগম খালেদা জিয়ার সমর্থকদের দৃষ্টিতে, তার নেতৃত্বে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা নতুন গতি পায়। বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর রাখার প্রচেষ্টার কারণে তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘গণতন্ত্রের মা’।
পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন থেকে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত তার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নির্বাচনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিরোধী মত দমন এবং ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার মাধ্যমে তিনি দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
দেশ তখন লুটেরাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। যারা কথা বলেছেন, তাদের কেউ হত্যার শিকার হয়েছেন, কেউ গুম হয়েছেন, কেউ টর্চার সেল কিংবা আয়নাঘরের কঠিন প্রকোষ্ঠে বন্দি থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার বর্ণনা শুনলে গা শিউরে ওঠে, চোখে পানি আসে। কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হলে মানুষ মানুষের ওপর এভাবে বর্বরোচিত নির্যাতন করতে পারে!
কথায় আছে, আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। অবশেষে ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে স্বৈরশাসন ও একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ততক্ষণে ঝরে যায় হাজারো ছাত্র-জনতার প্রাণ। শোকে-দুঃখে কাতর হয়ে পড়েন হাজারো মা-বাবা। ঢাকাসহ বাংলাদেশের পিচঢালা রাজপথ রক্তাক্ত হওয়ার পর পূর্ব আকাশে রক্তিম বার্তা নিয়ে গণতন্ত্র যেন আবারও পুনর্জন্ম লাভ করে।
তারপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে গ্রাম-গঞ্জ ও শহরে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে থাকে। এরপর আসে সেই মহেন্দ্রক্ষণ। খালেদা জিয়ার কথাই সত্যি হয়। লক্ষ-কোটি জনতার সামনে হাজির হন গণতন্ত্রের বরপুত্র তারেক রহমান। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। গঠিত হয় গণতান্ত্রিক সরকার। প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বারবার গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে, আবার একই পরিবারের হাত ধরে গণতন্ত্র পুনর্জন্ম লাভ করে দেশে পুনর্বাসিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র শহীদ জিয়াউর রহমানের পরিবারের হাতেই নিরাপদ। গণতান্ত্রিক সরকার যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে শাসনকার্য পরিচালনা করুক—এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক: প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক
চেয়ারম্যান, সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ






