আগামীর চোখ
প্রশ্নপত্র চাই সহজ কিস্তিতে!

প্রিয়
প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের ‘বড় ভাই’
আমি আপনার আন্ডারগ্রাউন্ড ডার্ক ওয়েবের একজন নিয়মিত ও বিশ্বস্ত ক্লায়েন্ট। অতিসম্প্রতি জানতে পারলাম, এবারের মহাগুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অলিখিত চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ লাখ টাকা! খবরটি পড়ে আনন্দের আতিশয্যে আমার চোখে পানি চলে এসেছে। বাজারে যখন আলু, পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচের দাম আকাশছোঁয়া, তখন আপনাদের মতো জনদরদি মহাপুরুষেরা যে মাত্র ১০ লাখ টাকায় আস্ত একটা ভবিষ্যৎ বিক্রি করছেন, এই ত্যাগের কোনো তুলনা হয় না।
আমরা যারা রাত জেগে, টেবিল ল্যাম্পের আলোয় চোখ লাল করে, মশার কামড় খেয়ে পড়াশোনা করার মতো আদিম ও মধ্যযুগীয় প্রথায় বিশ্বাসী নই, তাদের জন্য আপনারা সত্যিকারের দেবদূত। সত্যি বলতে কি ভাই, বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে মাথা নষ্ট করার চেয়ে, আপনার দেওয়া সুনির্দিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার পিডিএফের পাতা উল্টানো অনেক বেশি আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী। পরীক্ষার আগের রাতে শান্তিতে ঘুমিয়ে, সকালে পরীক্ষার হলে গিয়ে কেবল আপনাদের সরবরাহ করা ‘শতভাগ খাঁটি’ উত্তরগুলো বৃত্ত ভরাট করে চলে আসলেই হলো। এটি শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি আসলে নতুন বাংলাদেশের শর্টকাট ক্যারিয়ার গাইডলাইন!
আপনাদের ব্যবসায়িক সুনামের স্বার্থে একটি শক্তিশালী ‘রিফান্ড পলিসি’ থাকা জরুরি
তবে এই চমৎকার চুক্তির বাজারে আমার মতো সাধারণ এক প্রার্থীর দুয়েকটি ছোট্ট আবদার ছিল। প্রথমত গতবার যে প্রশ্নটি আপনি সরবরাহ করেছিলেন, সেটির প্রিন্ট কিছুটা ঝাপসা ছিল। পরীক্ষার হলে এমসিকিউ দাগাতে গিয়ে বেশ কষ্ট হয়েছে। প্রশ্নপত্রের মূল্য যেহেতু একটি মাঝারি সাইজের ফ্ল্যাটের ডাউনপেমেন্টের সমান, তাই আশা করব প্রশ্নপত্রের প্রিন্ট হবে একদম ঝকঝকে। দ্বিতীয়ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে এককালীন ১০ লাখ টাকা জোগাড় করা কিছুটা কঠিন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কথা বিবেচনা করে এই ১০ লাখ টাকার প্যাকেজটি কি কোনো ‘সহজ কিস্তি’ বা ইএমআই সুবিধায় পরিশোধ করা সম্ভব? যেমন— পরীক্ষার আগে ২ লাখ, প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর ৩ লাখ এবং পরীক্ষার হলে সফলভাবে নকল সাপ্লাইয়ের পর বাকি ৫ লাখ। এমনটা হলে আমাদের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু অলস মধ্যবিত্তদের প্রশ্ন কিনে মেধাবী হওয়ার স্বপ্নটা আরেকটু সহজ হতো।
অারেকটি প্রশ্ন, এই যে আপনারা ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র দেওয়ার গ্যারান্টি দিচ্ছেন, এর সঙ্গে কি কোনো ‘আফটার সেলস সার্ভিস’ আছে? ধরুন, পরীক্ষার হলে বসার পর যদি ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এসে কলার চেপে ধরে, তবে সেই হাজতবাসের খরচ কি আপনাদের এই ১০ লাখ টাকার প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত থাকবে? নাকি উকিল ফি আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে? আমার মনে হয়, আপনাদের ব্যবসায়িক সুনামের স্বার্থে একটি শক্তিশালী ‘রিফান্ড পলিসি’ থাকা জরুরি।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনারা যেভাবে রাতারাতি অযোগ্যকে যোগ্য এবং মেধাবী শূন্যদের মেরিট লিস্টের শীর্ষে বসিয়ে দিচ্ছেন, তার জন্য জাতি আপনাদের কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে। আমরা জিপিএ ৫ পেয়ে যখন বড় বড় পদে আসীন হব, তখনো আপনাদের এই ১০ লাখ টাকার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।
ইতি
প্রশ্নপ্রত্যাশী নব্য যুগের এক ‘মেধাবী’ পরীক্ষার্থী



