ক্ষমতায় গেলেই কেন আদর্শচ্যুতি হয় নেতাদের

বালেন শাহ
একসময় তাঁরা ছিলেন পরিবর্তনের প্রতীক। কেউ লড়েছেন গণতন্ত্রের জন্য, কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কেউ আবার সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতির শীর্ষে উঠেছেন। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘ যাত্রায় তাঁদের অনেকের রাজনৈতিক অবস্থান, আচরণ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। শুধু ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা নয়, আদর্শচ্যুতি, নৈতিক স্খলন, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং জবাবদিহির অভাব অনেক নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিতর্কিত করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনীতি এই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা, ভারতে ধর্মেন্দ্র প্রধান, নেপালের বালেন শাহ, শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে পরিবার কিংবা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, বিরোধী অবস্থানে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের কথা বলা অনেক নেতাই ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়ে ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কি একজন নেতাকে বদলে দেয়? নাকি ক্ষমতার কাঠামোই ধীরে ধীরে একজন নেতাকে তাঁর পূর্বের আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়? কেন এমন হয় যে, যাঁরা একসময় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেন, তাঁরাই পরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে সমালোচনার মুখে পড়েন?
ক্ষমতায় গিয়ে আদর্শচ্যুতি বা কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন উদাহরণ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রবণতা বারবার দৃশ্যমান হওয়ার পেছনে রয়েছে বিশেষ কিছু ঐতিহাসিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ।
দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ দীর্ঘদিন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। সেই সময়কার প্রশাসনিক কাঠামোতে জনগণের অংশগ্রহণের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর এসব দেশে গণতান্ত্রিক সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু হলেও প্রশাসনের অনেক স্তরে সেই নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব থেকে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব, পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব। ফলে অনেক ক্ষেত্রে একজন নেতা ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক অমরজিভ লোচান আগামীর সময়কে বলেছেন, “দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংকটকে শুধু ব্যক্তির চরিত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক কাঠামোতে জনগণের অংশগ্রহণের চেয়ে নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও অনেক দেশে সেই সংস্কৃতির প্রভাব রয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেছেন, “প্রতিষ্ঠান যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ব্যক্তি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, ব্যক্তিপূজা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।”
অধ্যাপক লোচানের এই বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এখানে সংকট শুধু কোনো একজন নেতার ব্যক্তিগত চরিত্রের নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশের, যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু একটি পদ নয়, এটি মানুষের চিন্তা ও আচরণেও গভীর প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে দেখেছেন, ক্ষমতার অনুভূতি মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও অনেক সময় তা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, অন্যের মতামত উপেক্ষা এবং নৈতিক বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম গ্যালিনস্কির গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমতার অনুভূতি মানুষকে বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তবে সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ব্যক্তি নিজেকে নিয়মের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করতে পারেন।
২০১০ সালে জোরিস লামার্স, ডিডেরিক স্টাপেল ও অ্যাডাম গ্যালিনস্কির এক গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের অন্যদের বিচার করার অধিকারী মনে করেন। তাঁরা অন্যের ভুল বা অনৈতিক কাজের কঠোর সমালোচনা করলেও নিজের আচরণের ক্ষেত্রে একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করেন না।
এই প্রবণতাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় কগনিটিভ বায়াস। অর্থাৎ ব্যক্তি নিজের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করার জন্য এমনভাবে চিন্তা করতে শুরু করেন, যাতে নিজের ভুলও সঠিক বলে মনে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যাকার কেল্টনার তাঁর ‘পাওয়ার প্যারাডক্স’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ সাধারণত সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণেই ক্ষমতায় ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলে সেই গুণগুলোই ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।
তাঁর মতে, ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্কের এমন কিছু প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যা অন্যের অনুভূতি বোঝার সঙ্গে যুক্ত। ফলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন।
এ ছাড়া ব্রিটিশ চিকিৎসক ও রাজনীতিক লর্ড ডেভিড ওয়েন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতাদের মধ্যে ‘হাইব্রিস সিনড্রোম’ বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের মানসিক প্রবণতার কথা বলেছেন। এতে একজন নেতা নিজের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত মনে করতে শুরু করেন এবং সমালোচনাকে শত্রুতার চোখে দেখতে পারেন।
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার ‘মোরাল ডিসএনগেজমেন্ট’ ধারণা অনুযায়ী, মানুষ অনেক সময় নিজের বিতর্কিত কাজকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার মানসিক কৌশল তৈরি করে। রাজনৈতিক নেতারাও অনেক সময় বিরোধী মত দমন বা কঠোর সিদ্ধান্তকে ‘রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয়’ বলে ব্যাখ্যা করেন।
অর্থাৎ, ক্ষমতা নিজে কাউকে অনৈতিক করে তোলে না। কিন্তু যখন ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহির অভাব যুক্ত হয়, তখন ব্যক্তির ভেতরের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা এই প্রশ্নের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনা ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ৷ ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেন। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে এসে টানা প্রায় দেড় দশক দেশ শাসন করেন।
তবে তাঁর দীর্ঘ শাসনামল ঘিরে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক। বিরোধী দল দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, গুম, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে।
বিরোধী রাজনৈতিক দল, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং অনেক বিশ্লেষক তাঁর শাসনকে ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক এমনকি ফ্যাসিস্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে আখ্যায়িত করেছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে।
সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে সরকারের মধ্যে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে বিরোধী মতকে গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে না দেখে হুমকি হিসেবে দেখা হতো।
তবে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন একই সঙ্গে একটি বড় প্রশ্নও সামনে আনে: একজন নেতা, যিনি একসময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন, দীর্ঘ ক্ষমতার পর কেন তাঁর শাসনই গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হলো?
সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতা ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব বোঝাতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত। রাজনীতির শুরুতে ধর্মেন্দ্র ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তরুণ বয়সে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আনে। পরবর্তী সময়ে তিনি দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে তাঁকেই একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৪ সালের কেন্দ্রীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করে।
পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের জুলাইয়ে এনইইটি-ইউজি-সহ পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্র-যুবদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, অবস্থান ও চাপের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধান শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
তাঁর ঘটনা রাজনৈতিক জীবনের এক বড় বৈপরীত্য সামনে আনে৷ যে ইস্যুতে তিনি একসময় আন্দোলনের অংশ ছিলেন, ক্ষমতার দায়িত্বে এসে সেই একই ইস্যুতে তাঁর প্রশাসনকেই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। তবে এটিকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। কারণ একজন মন্ত্রী শুধু ব্যক্তি নন, তিনি একটি বৃহৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের ঘটনা দেখায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর একজন নেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয়। কারণ তখন তাঁকে শুধু নিজের আদর্শ নয়, একটি পুরো ব্যবস্থার দায়ও বহন করতে হয়।
নেপালের রাজনীতিতে বালেন্দ্র শাহ বা বালেন শাহের উত্থানও ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা এবং শাসনের বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে বালেন শাহ রাজনীতির প্রচলিত ধারার বাইরে থাকা এক তরুণ মুখ হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পেশায় প্রকৌশলী ও র্যাপার বালেন দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নাগরিক সমস্যার দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতির কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন।
প্রথাগত রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে তাঁর উত্থানকে অনেকেই নেপালের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন। পরে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তবে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার পর তাঁর সামনেও কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ এবং ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, যে স্বচ্ছতা ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন, ক্ষমতার বাস্তবতায় এসে সেই আদর্শের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
বালেন শাহের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু জনপ্রিয়তা বা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা একজন নেতাকে সফল শাসকে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট নয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং নিজের ক্ষমতার সীমা মেনে চলা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মুখ বা নতুন আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতারাও যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকেন, তবে তাঁরাও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির একই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।
শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে পরিবার দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ।
মাহিন্দা রাজাপাকসে দীর্ঘদিন শ্রীলঙ্কার রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন ছিলেন। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর তিনি একজন শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। অনেক শ্রীলঙ্কান তাঁকে দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী নেতা হিসেবে দেখতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পরিবারকে ঘিরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ বাড়তে থাকে। রাজাপাকসে পরিবারের একাধিক সদস্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাব বেড়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা দুর্বল হয়।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শুরু হয় ব্যাপক গণআন্দোলন, যা ‘আরাগালয়া’ নামে পরিচিত হয়।
জনতার চাপের মুখে মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং তাঁর ভাই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন৷
শ্রীলঙ্কার ঘটনা দেখিয়েছে, জাতীয়তাবাদী জনপ্রিয়তা বা শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে না, যদি তার সঙ্গে সুশাসন, অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে পাকিস্তানও ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির সংকটের একটি বড় উদাহরণ।
দেশটির বেসামরিক সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সামরিক প্রভাব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কাজ করেছে ও করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত নেতারা ক্ষমতায় এলেও প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্যের অভাব তাঁদের শাসনকে দুর্বল করেছে।
পাকিস্তানের বহু রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে রাজনীতিতে আস্থা সংকট আরও গভীর হয়েছে।
আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। ২০০১ সালের পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় হামিদ কারজাই সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলেও পরে দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির অভিযোগের মুখোমুখি হয়। কারজাই নিজেও একসময় স্বীকার করেছিলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দুর্নীতির গভীরতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। প্রয়োজন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।
শেষ কথা: সমস্যা কি শুধু নেতাদের, নাকি ব্যবস্থার?
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়: ক্ষমতা মানুষের চরিত্রকে পরীক্ষা করে। একজন নেতা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যে আদর্শ, মূল্যবোধ ও প্রতিশ্রুতির কথা বলেন, ক্ষমতার বাস্তবতায় এসে তা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
শেখ হাসিনা, ধর্মেন্দ্র প্রধান, বালেন শাহ কিংবা রাজাপাকসে পরিবারের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও একটি জায়গায় তাদের মধ্যে মিল রয়েছে। তা হলো, ক্ষমতার সঙ্গে যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ব্যক্তি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ক্ষমতা মানুষের ভেতরের প্রবণতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। আর রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দেন, ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
তাই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শুধু ভালো নেতা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলে হবে না। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো নেতাই ক্ষমতার ঊর্ধ্বে থাকতে না পারেন।
কারণ গণতন্ত্রের শক্তি কোনো এক ব্যক্তির জনপ্রিয়তায় নয়, বরং সেই ব্যবস্থায়, যেখানে ক্ষমতাবানকেও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী




