সাবেক রাষ্ট্রপতি মুক্ত, সু চি’র পালা কবে?

অং সান সু চি
ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের কারামুক্তি ব্যাপক স্বস্তি এনেছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও প্রতিরোধ মহলে। তার মুক্তির আনন্দবার্তায় মুখরিত সামাজিক মাধ্যম। তবে এই আনন্দের মুহূর্তটি এক কঠোর বাস্তবতায় ম্লান। কারণ সাজার মেয়াদের প্রায় পুরোটাই জেলে ছিলেন উইন মিন্ট। এখনো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দি।
নতুন বছরের সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পেয়েছে সাড়ে চার হাজারের বেশি কয়েদি। সঙ্গে আছেন আরও শতাধিক রাজনৈতিক বন্দি। সাবেক প্রেসিডেন্টের মুক্তির পর এখন নতুন প্রশ্ন, পরবর্তী তালিকায় কি অং সান সু চি?
মিয়ানমারের সাবেক স্টেট কাউন্সিলর এবং দেশটির সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় গণতান্ত্রিক নেতা অং সান সু চি এখনো বন্দি। সম্প্রতি গুজব ছড়িয়েছিল গৃহবন্দি করা হবে তাকে। এ ঘটনাকে মনে করা হচ্ছে জান্তার সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ কৌশলের অংশ। কারণ খবরটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও তা ছিল জনমত যাচাইয়ের একটি চাল। একই সাধারণ ক্ষমায় তার সাজার মেয়াদ কমানো হলেও শেষ হয়নি বন্দিত্ব।
৮০ বছর বয়সী সু চি ভোগ করছেন ২৭ বছরের কারাদণ্ড। দুর্নীতি, উসকানি, নির্বাচনে কারচুপি এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই সাজা। সাধারণ ক্ষমায় সাজার মেয়াদ এক-ষষ্ঠাংশ কমলেও এখনো অনিশ্চিত তার ভাগ্য। তিনি কি কারাগারেই থাকবেন, নাকি গৃহবন্দি হবেন, অথবা জনচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যাবেন— তা রয়ে গেছে অজানাই।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আর দেখা যায়নি সু চিকে। তার অবস্থা সম্পর্কে সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য মিলেছিল ২০২৩ সালের জুলাই মাসে। তখন থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রমুদউইনাই তার সঙ্গে দেখা করেন নেপিদোতে। তিনি জানিয়েছিলেন, সু চি শারীরিকভাবে সুস্থ ও মানসিকভাবে চনমনে আছেন। সংকট সমাধানে সংলাপের পক্ষে তিনি। এরপর থেকে কেবল নীরবতা।
ধারণা করা হয়, তাকে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে নেপিদোর কাছে একটি সামরিক কম্পাউন্ডে। মাঝেমধ্যে শোনা যায় সাদা হয়ে গেছে তার চুল। বেশ দুর্বলও দেখাচ্ছে তাকে। তার অবস্থান বা অবস্থা সম্পর্কে জান্তার গোপনীয়তা বাড়িয়েছে জনমনে উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক মহলে দুশ্চিন্তা।
এই প্রেক্ষাপটে উইন মিন্টের মুক্তিকে দেখা হচ্ছে সুকৌশলী চাল হিসেবে। এটি কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। কারণ তার সাজার মেয়াদ প্রায় শেষের দিকেই ছিল। এখনো অনেক সিনিয়র রাজনীতিবিদ, আঞ্চলিক মুখ্যমন্ত্রী এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে।
চীন ফ্যাক্টর
এই সময়ের নেপথ্য বুঝতে তাকাতে হবে কারাগারের গেটের বাইরে। ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর বিক্ষোভ দমনে নৃশংসতা চালিয়েছিলেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। কিন্তু ২০২৩ ও ২০২৪ সাল নাগাদ দেশের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। প্রতিরোধের মুখে ক্ষমতা যখন নড়বড়ে, তখনই চীন তার পক্ষে করে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ।
বেইজিংয়ের সমর্থনে ২০২৫ সালে উত্তর শান রাজ্যের হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে জান্তা। এরপর সেই বছরের শেষের দিকে আয়োজন করা হয় নির্বাচন। গৃহযুদ্ধের মধ্যে কেবল জান্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন ছিল লোক দেখানো। ভোটের হার ছিল নগণ্য। তবুও কোনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন সেই ভোটে জান্তার প্রক্সি দল ইউএসডিপি জয়ী হলে প্রথম অভিনন্দন জানায় বেইজিং।
চীনা দূত দেং সিজুন এই নির্বাচনকে মিন অং হ্লাইং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার এক চুক্তির ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেই চুক্তির শর্তাবলী অস্পষ্ট হলেও ফলাফল ছিল সুনিশ্চিত। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় ইউএসডিপি। নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন মিন অং হ্লাইং। সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং পার্লামেন্টে (যেখানে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত) নিজের ক্ষমতা পোক্ত করেন।
চীনের সমর্থন এখন প্রকাশ্য। ১০ এপ্রিল মিন অং হ্লাইংয়ের অভিষেকের দিন তাকে শুভেচ্ছা পাঠান শি জিনপিং। আশা করা হচ্ছে শিগগিরই বেইজিং সফরে যাবেন নতুন প্রেসিডেন্ট। এই কূটনৈতিক প্রস্তুতির মাঝেই উইন মিন্টের মুক্তি এক ‘ইমেজ পালিশ’ করার পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে জান্তা ‘জাতীয় সমঝোতার’ ইঙ্গিত দিতে চায়। যদিও প্রকৃত ক্ষমতা থাকছে সামরিক বাহিনীর হাতেই।
বেইজিংয়ের উদ্দেশ্য অত্যন্ত বাস্তববাদী। তারা নিজেদের সীমান্তে স্থিতিশীলতা, বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করা এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এমন শান্তি আলোচনা চায় যা রক্ষা করবে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ। এই লক্ষ্য অর্জনে একমাত্র সহায়ক একটি গ্রহণযোগ্য মিয়ানমার জান্তা।
আন্তর্জাতিক বৈধতার জন্য মিন অং হ্লাইং চেষ্টা করছেন ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আসিয়ান সম্মেলনে ফেরার। অভ্যুত্থানের পর থেকে তাকে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নিষিদ্ধ করে আসিয়ান। এখন তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে মরিয়া।
সমঝোতা নয়, অবাধ্যতা
উইন মিন্টের মুক্তি আপস নয়, বরং ফুটে উঠেছে অটল মনোভাবই। কর্তৃপক্ষ সই করতে বলেছিল দণ্ডবিধির ৪০১(১) ধারায় একটি শর্তযুক্ত মুচলেকা। যেখানে বলা ছিল ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ করলে তাকে পুনরায় খাটতে হবে জেল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এনএলডি মুখপাত্র ড. মিয়ো নিউন্ট জানান, সই করতে রাজি হননি উইন মিন্ট। কারণ তিনি কোনো অপরাধ করেননি। সবসময় মেনে চলেছেন ধর্মীয় পঞ্চশীল নীতি। তার এই প্রত্যাখ্যান এক নিরব বার্তা দেয়— বৈধতা কখনো জোর করে আদায় করা যায় না।
সু চির মুক্তি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা অনুসরণ করছে এক পরিচিত রীতি । ২০১০ সালে স্বৈরশাসক থান শোয়ের সাজানো নির্বাচনের পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল গৃহবন্দি অবস্থা থেকে। সেই পদক্ষেপটি খুলে দেয় সীমিত রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথ। পরবর্তী সময়ে এনএলডি বিশাল জয় পায় ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে।
উল্লেখ্য, আগেভাগেই সু চির সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিল বেইজিং। ২০১৫ সালে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাকে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বর্তমানে সু চি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও তার প্রতীকী শক্তি অপরিসীম। তার বাবা জেনারেল অং সানের মতো তিনিও সাধারণ মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধার পাত্র। জান্তার দীর্ঘ প্রচেষ্টাতেও সম্ভব হয়নি তার নাম মুছে ফেলা।
উইন মিন্টের মুক্তিকে সমঝোতা হিসেবে তুলে ধরছে জান্তা। বাস্তবে এটি প্রহসনমূলক পদক্ষেপ। এটি করা হয়েছে কূটনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য। সামরিক শাসনকে পাকাপোক্ত করা এর লক্ষ্য। এমনকি সু চি মুক্তি পেলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো একজন ব্যক্তির মুক্তি মানেই জবরদস্তি আর দায়মুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যবস্থার অবসান নয়।
মিয়ানমার সংকট কেবল প্রতীকী মুক্তির মাধ্যমে সমাধান হবে না। সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি এবং সামরিক বাহিনীর হাত থেকে প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া এই পদক্ষেপগুলো কেবলই নাটক। উত্তরণ নয়।
লেখক: সংবাদ মাধ্যম দ্য ইরাবতীর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক

