সম্পাদকীয়
পৈশাচিক!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জীবন কেড়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে ভয়াবহ অপরাধ। সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে ধরনের বীভৎস নৃশংসতা যুক্ত হচ্ছে, তা শুধু অপরাধের ভয়াবহতাই নয়, মানুষের বিবেক ও মানবিকতার গভীর অবক্ষয়েরও জানান দিচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবারের আগামীর সময়ে ‘খুনেই শেষ নয়, সঙ্গে বীভৎস নৃশংসতা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। মানুষ খুন করার পরও যখন হত্যাকারীর নিষ্ঠুরতা থামে না, মৃতদেহের প্রতি যখন ন্যূনতম সম্মান দেখানোর বোধটুকু হারিয়ে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে— সমাজ কোন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে?
খুনি যখন আরেকজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পর মরদেহকে টুকরো টুকরো করে বা পুড়িয়ে পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তখন বোঝা যায় তার বিবেক কতটা অসাড় হয়ে পড়েছে। প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে গেলে সহিংসতা সহজ হয়ে যায়। তখন সেটি মানবিকতার ওপর চরম আঘাত। প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী, আবার অটোরিকশা ছিনিয়ে নিতে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে চালককে। এভাবেই দেশের আট জেলায় আততায়ীর অস্ত্রে ঝরেছে ১১ প্রাণ। শুধু খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি খুনিরা, কোথাও করা হয়েছে লাশ টুকরো টুকরো, কোথাও বা ঘুমন্ত বাবাকে হত্যা করা হয়েছে কুপিয়ে, আবার ৭০ বছরের নারীকে একা পেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নারী বা বয়স্ক বলে সম্মান করা হয়নি।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব হত্যাকাণ্ড যে অপরিচিত মানুষের মাধ্যমে ঘটছে, তা নয়। কখনো পরিবারের সদস্য, কখনো স্বজন, কখনো দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষই হয়ে উঠেছে খুনি। যে ঘরে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও আশ্রয় পাওয়ার কথা, সেই ঘরেই যদি জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সমাজের পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বজনের হাতে স্বজনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত।
কেন এমন হচ্ছে? এর কোনো একক উত্তর নেই। সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক চাপ, প্রতিহিংসা, অপরাধপ্রবণতা, মানসিক অসুস্থতার যথাযথ চিকিৎসার অভাব, মাদকাসক্তি এবং দ্রুত বিচার ও শাস্তির অনিশ্চয়তা— বিভিন্ন কারণে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে মাদক অপরাধের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের বিচারবোধ ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ভয়ংকর আচরণে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু স্বাস্থ্য বা আইনশৃঙ্খলার আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সামাজিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা অপরাধ দমনের অন্যতম ভিত্তি। অপরাধী যদি মনে করে তার প্রভাব, অর্থ বা যোগাযোগ তাকে রক্ষা করবে, তাহলে আইনের প্রতি ভয় কমে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সহনশীলতা, মতের অমিল মেনে নেওয়া, রাগ নিয়ন্ত্রণ, অন্যের প্রতি সম্মান, বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান এবং দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা— এসব শিক্ষার অংশ হওয়া চাই।
প্রকাশিত প্রতিবেদনটি দেশ-জাতি ও সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মানুষের হাতে মানুষের নিরাপত্তা যদি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, স্বজন যদি স্বজনের শত্রু হয়ে ওঠে, মাদক যদি তারুণ্যের বিবেক গ্রাস করে এবং অপরাধী যদি আইনের ভয় হারিয়ে ফেলে, তাহলে উন্নয়নের অনেক অর্জনও নিরাপত্তাহীনতার কাছে ম্লান হয়ে যাবে।
মানুষের ভেতরের হিংস্রতাকেও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। মরদেহের প্রতি যে সমাজের সম্মান নেই, শেষ পর্যন্ত সে সমাজ জীবিত মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারে না। তাই আজ প্রয়োজন শুধু অপরাধ দমন নয়— বিবেক, মূল্যবোধ ও মানবিকতার পুনর্জাগরণ।



