সম্পাদকীয়
ঘোড়ার আগে গাড়ি, চলবে না

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ট্যাব বিতরণের খবর আসে, যেখানে ওয়েবসাইট তো দূরের কথা, ন্যূনতম বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগেরও নিশ্চয়তা নেই; তখন পুরো বিষয়টি ছেলেখেলায় পরিণত হয়। শনিবার দৈনিক ‘আগামীর সময়’-এ ‘বিদ্যুৎই নেই ট্যাব যাচ্ছে’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে তেমন চিত্রই দৃশ্যমান হয়েছে। খবরটিতে বলা হয়— শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই ওয়েবসাইট। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ট্যাবলেট (ট্যাব) দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ডিভাইসের যথাযথ ব্যবহার হবে কি না এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ছাড়া এভাবে কোটি কোটি টাকার প্রযুক্তিপণ্য বিতরণ আসলে কার স্বার্থে? এটি কি সত্যিই শিক্ষার মানোন্নয়ন, নাকি শুধুই সরকারি অর্থ অপচয় আর সস্তা প্রচারণার কৌশল? একটি কম্পিউটার বা ট্যাব সচল রাখার প্রথম শর্ত হলো বিদ্যুৎ। প্রযুক্তিপণ্য সচল রাখার মৌলিক সুবিধাই যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে ডিভাইস পাঠানো ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল।
দেশের অনেক পরিকল্পনা যে অপরিকল্পিত, দূরদর্শিতার অভাব ও মেধার স্বাক্ষর নেই— এমন অনেক দৃষ্টান্ত আমরা এর আগে দেখেছি। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়, অথচ সুবিধাপ্রত্যাশীরা হয় বঞ্চিত। সরকারি কোষাগারের অর্থ জনগণের পকেট থেকেই যায়। সেটার সঠিক ব্যবহার যদি না হয়, তাকে নিঃসন্দেহে অপচয় বলতে হয়।
সরকারের উদ্দেশ্য মহৎ, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হবে স্মার্ট। সেজন্য এই ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ ও ডিজিটাল ক্লাসরুম করার কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। এটি বাস্তবায়ন করতে আসন্ন বাজেটে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অর্থায়ন হলে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে এ কর্মসূচি। কিন্তু সরকারের স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে কত ফারাক, তা বোঝা যায় প্রকাশিত সংবাদটিতে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের আওতাধীন ২৩ হাজার ২৩৭টি স্কুল-কলেজের মধ্যে নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই— এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩ হাজার ৯২টি। কোথাও ওয়েবসাইট আছে, তবে হালনাগাদ নেই ৯৬১টিতে। অর্থাৎ, ডিজিটাল তথ্যসেবার বাইরে দেশের ৫৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার গ্রামাঞ্চলে দিনের উল্লেখযোগ্য সময় বিদ্যুতের নিশ্চয়তা নেই। এমন বাস্তবতা নিয়ে যদি প্রকল্প এগিয়ে যায়, তবে ফল আশানুরূপ হবে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ওয়েবসাইটের অনুপস্থিতি এবং ইন্টারনেটহীনতা। এ সময়ে শিক্ষণপদ্ধতি ও শেখানো কার্যক্রম অনেকাংশেই অনলাইন রিসোর্স, ই-বুক এবং শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া এ ট্যাব বা কম্পিউটারগুলো স্রেফ ‘ডিজিটাল খেলনা’ বা শো-পিস ছাড়া আর কিছুই নয়। এ আশঙ্কা অমূলক নয় যে, উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে এ ডিভাইসগুলোর সিংহভাগই বিদ্যালয়ের আলমারিতে বাক্সবন্দি হয়ে থাকবে। জনগণের কোটি কোটি টাকায় কেনা প্রযুক্তি কোনো কাজেই আসবে না। তা ছাড়া অধিকাংশ গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। শিক্ষা খাতের বাজেট যেখানে সীমিত, সেখানে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ না করে এভাবে লোকদেখানো ‘ডিজিটাল’ তকমা লাগানোর তাড়না নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে।
এমন বাস্তবতায় আগামী ৪ জুনের মধ্যে সব স্কুল-কলেজকে ওয়েবসাইট তৈরি বা হালনাগাদের জন্য গত ২১ মে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি। এ নির্দেশনা দ্রুত শতভাগ কার্যকর হবে বলে আমরা প্রত্যাশী। সবচেয়ে বড় কথা, অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় দেওয়ার অাগে এসব বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে।






