সম্পাদকীয়
এবার টিকে থাক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীতে চার হাজারের বেশি বাস চলাচল করে। এই বাসের প্রতিটিতে নারীদের জন্য মাত্র ৯টি আসন সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু অধিকাংশ সময় সংরক্ষিত সেই আসনগুলোতে পুরুষ যাত্রীদের বসে থাকতে দেখা যায়। প্রতিবাদ করলেও আসন ছাড়তে চান না অনেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঝগড়ায় রূপ নেয়। এ ছাড়া বাসে নারীরা বিভিন্ন সময় শারীরিক হেনস্তা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের জন্য পৃথক বাস সার্ভিসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস চালু করছে আজ।
রাজধানীর সড়কে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের উদ্যোগ নতুন নয়। শেষ তিন দশকে একাধিকবার নারীদের জন্য এমন বাস সার্ভিস নামানো হলেও নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় বারবারই তা সড়ক থেকে হারিয়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে বিআরটিসি সর্বপ্রথম নারীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বাস সার্ভিস চালু করে। ২০০১ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সেবা সম্প্রসারণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে ওই সেবা বন্ধ ও ফের চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ‘দোলনচাঁপা’ নামে চারটি বাস চললেও ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবরে সেই সেবাও বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন এ উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলবে ১০টি বাস। পাশাপাশি বগুড়া ও চট্টগ্রামে চলবে আরও চারটি বাস। এবারের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে এসেছে বাসের চালক ও চালকের সহকারী— দুজনই থাকবেন নারী। সেই সঙ্গে বেড়েছে রুট।
অতীতের নারী বাস সার্ভিসগুলো টিকতে না পারার কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় ছাড়া দিনের বাকি সময় পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় বাসগুলো মারাত্মক আর্থিক লোকসানে পড়ে। যার ফলে জ্বালানি খরচ, স্টাফদের বেতন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তবে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকার অন্যতম কারণ ছিল বাসের সীমিত সংখ্যা ও অনির্দিষ্ট সময়সূচি। বাসের অপেক্ষায় নারী যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, যার ফলে সৃষ্টি হতো চরম ভোগান্তির। তা ছাড়া কারিগরি ত্রুটিতে বিকল হওয়া বাসগুলো মেরামতের অভাবে ডিপোতে দীর্ঘ সময় অকেজো হয়ে পড়ে থাকার ঘটনাও রয়েছে। ফলে নারী যাত্রীরা বিকল্প উপায়ে চলাচল করতে শুরু করেন। এ ছাড়া নারী বাস সার্ভিসের প্রচারণারও অভাব ছিল। অনেক নারী যাত্রী বাস সেবা সম্পর্কে জানতেন না। ফলে একটি বড় অংশের নারী যাত্রী বাস সেবার বাইরেই থেকে গেছেন। সার্বিকভাবে বললে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবেই নারীদের জন্য চালু করা এ বাস সার্ভিসগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।
নারী বাস সার্ভিসের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অতীতে শুধু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রচারণার অভাবে সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে। রুট নির্ধারণ থেকে শুরু করে যাত্রী সচেতনতা তৈরি এবং সুশৃঙ্খল পরিচালন ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নারী বাস সার্ভিস শুধু একটি পরিবহন সেবা নয়; এটি কর্মজীবী ও সাধারণ নারীদের নিরাপদ চলাচলের মৌলিক অধিকারও। তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক তদারকির মাধ্যমে এ প্রশংসনীয় উদ্যোগটিকে একটি স্থায়ী ও কার্যকর সেবায় রূপ দিতে হবে।






