সম্পাদকীয়
নারীর পাতেই কেন পুষ্টি নেই

একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধিশালী জাতি-সমাজ গঠনে নারীর সুস্বাস্থ্য অপরিহার্য। একজন মা-ই পারেন তার পরবর্তী প্রজন্মকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠায় সাহায্য করতে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে হতাশ হতে হয়। দেশে অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পরিবারে খাদ্য নিরাপত্তার যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তার প্রথম শিকার হচ্ছেন নারী। এতে পুষ্টির অভাবে তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির যে অবস্থা হয়, তার প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। শনিবারের ‘আগামীর সময়’ এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, সর্বশেষ জাতীয় পুষ্টি জরিপ অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নন— এমন নারীদের মধ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি উদ্বেগজনক। জরিপে আরও বলা হয়েছে, এমন নারীদের মধ্যে ভিটামিন ডি ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ৭১ শতাংশ। জিংকের ঘাটতি রয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং আয়োডিনের অভাব রয়েছে ২৯ শতাংশ। এই জরিপ আরও বলছে, মৃদু থেকে তীব্র রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন ৩০ শতাংশ— অর্থাৎ প্রতি তিনজন নারীর একজনের রয়েছে রক্তস্বল্পতা। এ তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। নারীর এমন পুষ্টির অভাবে আগামী প্রজন্ম ভগ্ন স্বাস্থ্য, মেধাহীন হয় কি না— পুষ্টিবিদ, স্বাস্থ্য ও সমাজ বিজ্ঞানীদের রয়েছে আশঙ্কা।
রাষ্ট্রের উদাসীনতার সঙ্গে দায়িত্বহীনতা নারীর পুষ্টির অভাবকে বেগবান করে তুলছে। বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। নিত্য খাদ্যপণ্য ও পুষ্টির উৎস— সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই অর্থনৈতিক টানাপড়েনের সবচেয়ে বড় ও নীরব শিকার পরিবারের নারীরা।
শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজে একটি সনাতন ও ঐতিহ্যগত মানসিকতা এখনো চলমান। নারী সংসারে অনেকটা প্রদীপের মতো। নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলো দেন। অর্থাৎ পরিবারের সবাইকে খাইয়ে শেষে যা অবশিষ্ট থাকে, তা-ই তারা খান। দ্রব্যমূল্য বাড়ার কারণে এখন সংসারে খাবারের বাজেট সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকোচনের মধ্যে নারীরা নিজের খাবারের পরিমাণ ও গুণগত মান সবার আগে কমিয়ে দেন। খাবারের সিংহভাগ স্বামী-সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেন। এটি বাঙালি নারীর চিরন্তন স্বভাব। তাদের এ ত্যাগী ও মহৎ মানসিকতার জন্যও পুষ্টির ঘাটতি পড়ে নিজের শরীরে। এর ফলে পুরো পরিবারের ভিত্তিও দুর্বল হয়। পুষ্টিহীনতার মধ্যেই ঘরের ও বাইরের কাজের বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে নারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। একজন পুষ্টিহীন মা বা নারী একটি সুস্থ পরিবারের দেখভাল করতে পারেন না। অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের ক্ষেত্রে এই পুষ্টিহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জাতীয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই নারীর পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। এটি শুরু হতে পারে পরিবার থেকে। বাজারের পরিস্থিতি রাতারাতি বদলাবে না। খাবার বণ্টনে সমতা রাখাই পূর্বশর্ত। লিঙ্গ বা বয়সভেদে নয়, বরং শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার বণ্টন করতে হবে। নারী সদস্যটি ঠিকমতো খাচ্ছেন কি না, তা স্বামী বা সন্তানদের খেয়াল রাখতে হবে। পরিবারের প্রধানেরও দায়িত্ব এটি। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস করলে কে কম খেল বা কে ভালো খাবার পেল না, তা সহজেই নজরে আসে।
স্বাভাবিক কারণেই নারীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এখানে রাষ্ট্রের দায় অাছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারও জরুরি। প্রয়োজনে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী উঠান বৈঠক এবং পরিবারের প্রধান কর্তার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে পারেন। সেখানে নারীর পুষ্টি নিশ্চিতের বিষয়টি পাবে প্রাধান্য।




