এখনো মব!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ও এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও জাতীয় ইতিহাসের স্থান কোনো একক দলের সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে ১৫ আগস্টের মতো একটি মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির দিনে দলীয় পরিচয়ের বাইরে সাধারণ নাগরিক বা কোনো সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা স্মরণ করা মৌলিক অধিকারের অংশ। কিন্তু গত শনিবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে আসা ব্যক্তিদের ওপর যেভাবে হামলা, মারধর ও শারীরিক হেনস্তা করা হয়েছে, তা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অনভিপ্রেত ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেই। পুলিশ পাহারার মধ্যে কিছু ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অন্যদের শারীরিক হেনস্তা করছে, এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে কিংবা মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে— এমন দৃশ্য রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তা বোধের জন্য শুভ নয়। আইন অনুযায়ী, অপরাধী বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে শনাক্ত ও আটক করার একচ্ছত্র এখতিয়ার শুধু রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেখানে কোনো তৃতীয়পক্ষ যদি ক্ষমতার দাপটে বলপ্রয়োগ করে, তবে তা সরাসরি পুলিশের সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
পুলিশের উপস্থিতিতে নাগরিকরা আক্রান্ত হলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোবলকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিগত সময়ের নানা রাজনৈতিক টানাপড়েন ও পরিবর্তনের পর থেকে পুলিশ যেখানে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, সেখানে এমন ঘটনা তাদের পেশাগত আস্থাকে দুর্বল করে তোলে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে আক্রান্ত ব্যক্তির সুরক্ষায় পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করছে, তখন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর থেকে নাগরিকদের ভরসা উঠে যায়।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে ‘মব কালচার’ ও নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে যে কাউকে পতিত সরকারের দোসর ট্যাগ দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল। আশা ছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে দেশে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ফিরলে এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সহনশীল পরিবেশ তৈরি হবে। নতুন পথচলায় সমাজে বহুল কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত হবে বলে নাগরিক সমাজ প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু রাজপথে সংঘটিত এসব বিশৃঙ্খলা ভিন্ন বার্তা দেয়, যা সমাজে নতুন করে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
এখানে বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট দলের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার নয়; বরং বিষয়টি স্পষ্টত মৌলিক মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসনের। একটি দেশে মতপ্রকাশ বা শ্রদ্ধা নিবেদনের মতো বিষয়ের ওপর যখন উগ্র মব চড়াও হয় এবং রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানে দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তখন সমাজের গণতান্ত্রিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাজপথে যেকোনো ধরনের সংঘাত ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা না গেলে সমাজে টেকসই শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অধরাই থেকে যাবে।






