সম্পাদকীয়
ই-টেন্ডার যেন ‘ম্যানুয়াল’ ফাঁদে না পড়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একদা ‘টেন্ডারবাজির’ মতো যে শব্দবন্ধগুলো প্রাত্যহিক খবরের কাগজের শিরোনাম দখল করে রাখত, আজ তারা যেন বিদায় নিয়েছে। ‘টেন্ডার বাক্স ছিনতাই’, ‘ঠিকাদার খুন’ কিংবা ‘ক্ষমতাসীন দলের কোন্দল’—সরকারি কেনাকাটার এই চিরাচরিত ছবিটিকে বদলে দিয়েছে একটি আধুনিক ব্যবস্থা। আগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘ই-টেন্ডারে নীরব বিপ্লব’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি সেই রূপান্তরের কথাই মনে করিয়ে দেয়। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে এক নীরব, অথচ যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) চালুর ফলে দরপত্র জমা দেওয়া নিয়ে রক্তারক্তি এখন অতীত। বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) তদারকিতে এই আধুনিকীকরণ বিশ্বের দরবারেও আজ প্রশংসিত। তানজানিয়া থেকে অস্ট্রিয়া— নানা দেশ আজ বাংলাদেশের এই ডিজিটাল মডেল থেকে পাঠ নিতে আসছে, যা নিঃসন্দেহে এক মহৎ গৌরবগাথা।
কিন্তু মুদ্রার এই উজ্জ্বল পিঠটি দেখার পাশাপাশি অপর পিঠের অন্ধকারটুকুও অগ্রাহ্য করা চলে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রযুক্তি আনার ইতিহাস এ দেশে নতুন নয়। সমস্যা বাধে তখনই, যখন সেই প্রযুক্তির চাকচিক্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা বারবার দেখেছি, মহাসমারোহে চালু হওয়া বহু ইন্টারনেটভিত্তিক নাগরিক পরিষেবা কিছুদিনের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে। কখনো দেখা যায় সার্ভার ‘ডাউন’ হয়ে বসে আছে, কখনো বা সাইটটি এতটাই জটিল যে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে তা এক গোলকধাঁধা। ই-টেন্ডারের ক্ষেত্রেও যদি একই ব্যাধি সংক্রমিত হয়, তবে এই ‘নীরব বিপ্লব’ যেকোনো মুহূর্তে ‘নীরব কান্নায়’ রূপ নিতে পারে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং স্বচ্ছতা আনা। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, কিছুদিন যেতে না যেতেই এই অনলাইন ব্যবস্থার সমান্তরালে এমন কিছু অদ্ভুত ম্যানুয়াল বা সনাতনী শর্তের পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়, যা ব্যবহারকারীকে আরও গভীর হয়রানির মধ্যে ফেলে দেয়। অনলাইনে দরপত্র জমা দেওয়ার পরেও যদি কাগজের ফাইল নিয়ে সরকারি অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় কিংবা দুর্নীতির চোরাপথ খোলা রাখতে প্রচ্ছন্ন ‘ম্যানুয়াল’ ফাঁকফোকর তৈরি করা হয়, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক। প্রযুক্তিকে স্বচ্ছতার হাতিয়ার না করে যদি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের নতুন ফাঁদ বানানো হয়, তবে ডিজিটাল রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
প্রতিবেদনে আইএমইডি সচিবের মন্তব্যে উঠে এসেছে দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথা। বিশেষ করে উপজেলা স্তরে কর্মকর্তাদের এই প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার খামতিটি এখনো স্পষ্ট। এই ঘাটতি দ্রুত দূর করতে হবে। শতভাগ সরকারি ক্রয়কে ই-জিপির আওতায় আনার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তার জন্য শুধু আইন সংশোধন বা নতুন বিধিমালা তৈরিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকাঠামোর সার্বিক আধুনিকীকরণ। ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ার সার্ভার যাতে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে এবং তা যেন সম্পূর্ণ ‘ইউজার ফ্রেন্ডলি’ বা ব্যবহারকারীবান্ধব হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিপ্লব আনা কঠিন, কিন্তু সেই বিপ্লবের সুফল ধরে রাখা আরও কঠিন। আস্তাবলে ঘোড়া চুরির পর তালা লাগানোর চেয়ে আস্তাবলটি যাতে সুরক্ষিত থাকে, সেই নজরদারি চালানোই বুদ্ধিমানের কাজ। ই-টেন্ডারের এই সাফল্য যেন সাময়িক চমক হয়ে না থেকে যায়। সরকারি ক্রয়ের এই আধুনিক ব্যবস্থাটি যেন আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার ফাঁসে দমবন্ধ হয়ে না মরে। সরকার এই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত ত্রুটিমুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা নিশ্চিত করবে— এটুকুই প্রত্যাশিত।




