তিন রাক্ষস গিলে খায় বাজেটের ভালো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাজেটে টাকার পাহাড়সম আকার দেখে আপ্লুত হওয়ার মানুষ এ দেশে কম নেই। কিন্তু সেই পাহাড়ের চূড়া থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে সুফল পৌঁছাবে, নাকি তা শুধুই শুভংকরের ফাঁকি হয়ে থাকবে, সে প্রশ্নটি চিরন্তন। প্রতি বছর ঢাকঢোল পিটিয়ে যে খসড়া পেশ হয়, তার বাস্তবায়নের রূপরেখা বরাবরই অন্ধকারে থেকে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা বরাদ্দ বাড়িয়েই নিজেদের কর্তব্য শেষ ভাবেন। অথচ বরাদ্দ বাড়লেই যে জনগণের ভাগ্য ফিরবে, এমন সরল সমীকরণ অর্থনীতিতে খাটে না। আসল সংকট রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা তিনটি মারাত্মক ব্যাধিতে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান যথার্থই রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান ব্যাধির দিকে আঙুল তুলেছেন। দুর্নীতি, বাস্তবায়নের ব্যর্থতা এবং অপচয়। এই তিন রাক্ষস মিলে প্রতি বছর বাজেটের ভালো উদ্যোগগুলো চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। দুর্নীতি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাধি। এ নিয়ে বিস্তর হা-হুতাশও হয়। কিন্তু কোনো ওষুধ মেলে না। কারণ যারা নিরাময় করবেন, তাদের একাংশ নিজেই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। দুর্নীতির হাত ধরেই আসে বাস্তবায়নের চরম ব্যর্থতা। একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার জন্য। কিন্তু কালক্রমে তার মেয়াদ বাড়ে, ব্যয় বাড়ে, কাজের কাজ কিছুই হয় না। টাকা খরচ হয়ে যায় অথচ সাধারণ মানুষ তার সুফল পায় না। দীর্ঘসূত্রতার এই চাদরে ঢাকা পড়ে যায় জনগণের ট্যাক্সের টাকা।
এরপর আসে অপচয়ের মহোৎসব। বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে, যার কোনো বাস্তব উপযোগিতা নেই। অকেজো এবং অলাভজনক সংস্থাকে টিকিয়ে রাখতে বাজেট থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। এই রাষ্ট্রীয় অপচয় বন্ধ করা গেলে বাজেট ঘাটতি অনেকটাই কমে আসত। বাজেটের সঙ্গে যদি তিন মাস অন্তর জবাবদিহি এবং বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকে, তবে একে একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার অতিরিক্ত কিছু ভাবা কঠিন।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও সেই একই পুরনো রোগ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের ওপর সব বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সরকার নিশ্চিন্তে বসে থাকে। অথচ এনবিআরবহির্ভূত কর আদায়ের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা যেন দেখেও দেখে না প্রশাসন। স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনকে অন্ধকারে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় ঘরে বসে বিধি তৈরি করে। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে পেশাদারিত্বের অভাব স্পষ্ট। অর্থনীতির ভিত শক্ত করতে হলে ব্যাংক খাতের স্থায়িত্ব, আইনশৃঙ্খলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এই বুনিয়াদি শর্তগুলো পূরণ না করে শুধু বড় বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখা আর আকাশকুসুম কল্পনা করা একই কথা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের বিন্যাস দেখলে শুধুই হতাশা বাড়ে। প্রান্তিক কৃষকের হাতে আজও কার্ড পৌঁছায় না অথচ তার ঘামেই দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে যেটুকু অর্থ বরাদ্দ হয়, তার সিংহভাগই চলে যায় অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহে। মূল যে লক্ষ্য, অর্থাৎ মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা, তা অপূর্ণই থেকে যায়। করোনা-পরবর্তী শিখন ঘাটতি এখন একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’-এর মতো চটকদার ও বৈষম্যমূলক প্রযুক্তিগত চমক দিয়ে শিক্ষার মূল ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। জনসংখ্যাকে উন্নয়নের কেন্দ্রে না রাখলে, বাজেট শুধু আমলাতান্ত্রিক খতিয়ান হয়েই থাকবে, দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাবে না।




