সম্পাদকীয়
রক্তের চাদরে ঢাকা সমাজ, লাশটি কার?

মাথা আর ধড় আলাদা হয়ে পড়ে আছে সাত বছরের এক শিশুর। কোথাও একজোড়া কানের দুলের জন্য খুন হচ্ছেন গৃহশিক্ষিকা, কোথাও আবার সামান্য জমির বিরোধে কেটে নেওয়া হচ্ছে মানুষের হাত। বুধবার আগামীর সময় পত্রিকায় প্রকাশিত ‘চুন খসলেই খুন’ শিরোনামের বিশেষ প্রতিবেদনটি আমাদের চোখের সামনে এক বীভৎস সত্যকে উন্মোচিত করেছে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এখন রক্তের উগ্র গন্ধ। চুন খসলেই যেন নেমে আসছে খুনের খাঁড়া। কোনো শত্রুতা নয়, অতি সামান্য স্বার্থ আর ক্ষণিকের আক্রোশে মানুষ অবলীলায় কেটে ফেলছে মানুষের গলা। এক ভয়ংকর খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র।
পুলিশের পরিসংখ্যান শিউরে ওঠার মতো। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক পচনশীল সামাজিক ব্যাধি। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘সাংস্কৃতিক ব্যবধান’। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি নেই। ফলে ভেঙে পড়ছে যৌথ বোধ, আলগা হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। মানুষের সহনশীলতা আজ শূন্যের কোঠায়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই আদিম হিংস্রতা আসলে এক চরম মানসিক বিকার ও গণ-অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। মানুষের ভেতরের নৈতিক রাশ সম্পূর্ণ আলগা হয়ে গেছে। রাগ, ক্ষোভ, হতাশা আর হীনম্মন্যতা যখন দীর্ঘদিন ধরে মনে জমাট বাঁধে, তখন সামান্যতম উসকানিতেও তা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। শৈশব থেকে মানবিক মূল্যবোধ আর সহানুভূতির শিক্ষা না পাওয়ায়, মানুষ আজ চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। যে সমাজে কোলের শিশুর কান্না থামানোর জন্য তাকে আছড়ে মারা হয়, কিংবা পরকীয়ার জেরে নিজের সন্তানকে বলি দেওয়া হয়, সেখানে জনমানসিক সুস্থতা যে সম্পূর্ণ অবক্ষয়িত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যেকোনো অপরাধের এই বেপরোয়া বাড়বাড়ন্তের পেছনে থাকে বিচারহীনতার নোংরা সংস্কৃতি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ধীরগতির বিচারব্যবস্থা এ অপরাধপ্রবণতাকে পরোক্ষভাবে লাইসেন্স দিচ্ছে। অপরাধী যখন দেখে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া সহজ, প্রভাব বা অর্থের জোরে সব হয়, তখন তার ন্যূনতম ভয়ডরটুকুও উবে যায়। অথবা, কোনোমতে অপরাধ বা লাশটি গোপন কিংবা পরিচয়হীন করে দেওয়া যায়, তাহলেই দায়মুক্তি সম্ভব— এমন ভাবনাও অপরাধীকে আরও নৃশংস করে তুলছে। আইনের শাসন যখন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়, তখন সমাজে শুরু হয় মাৎস্যন্যায়। যেখানে সবলরা দুর্বলদের গিলে খায়। দ্রুত মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক ও দৃশ্যমান গতিশীল শাস্তি না হলে এ অন্ধকার নরক থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।
শুধু পুলিশি লাঠি বা গৎবাঁধা তৎপরতা দিয়ে এ সামাজিক পতন রোধ করা অসম্ভব। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর দিকে ফিরে তাকাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিতে হবে সহনশীলতা ও নৈতিকতার পাঠ। বাড়াতে হবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতা। সমাজ নামক এই যৌথ নৌকোয় যদি একের পর এক ফুটো তৈরি হতে থাকে, তবে ডুবতে হবে আমাদের সবাইকেই। তা না হলে আজ যে শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা বাথরুমে পড়ে আছে, কাল সেই তালিকায় আপনার বা আমার সন্তানও যুক্ত হতে পারে।




