প্রাণঘাতী অবহেলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি শিল্পদুর্ঘটনা নয়; এটি শিল্পনিরাপত্তা, শ্রমিকের জীবন এবং পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থাপনার প্রতি এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। গত শুক্রবার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ কাটার সময় এ প্রাণহানি ঘটে। গ্যাসমুক্ত না করেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরু করা হচ্ছিল কি না, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। তবে প্রাথমিক তথ্যই বলছে, এখানে অবহেলার অভিযোগ স্পষ্ট।
আরও উদ্বেগজনক হলো, জাহাজভাঙা শিল্পে এমন মৃত্যু নতুন ঘটনা নয়। গত ১০ (২০১৬-২৬) বছরে দুর্ঘটনায় ১০৪ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর জানা যায়। তবে শুধু বিষাক্ত গ্যাসে সুনির্দিষ্টভাবে কতজন মারা গেছেন, তার একক বা আলাদা কোনো পৃথক পরিসংখ্যান সাধারণত প্রকাশিত হয় না; বরং সামগ্রিক হিসাবই বড় পরিসরে রাখা হয়। প্রশ্ন হলো, এত প্রাণহানির পরও কেন একই চিত্র বারবার ফিরে আসে?
বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮ নামে একটি আইন রয়েছে। এ আইনের অধীনে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডও আছে; জাহাজ আমদানি বা সংগ্রহের আগে বোর্ডের অনাপত্তি সনদ এবং পরিদর্শনের পর ছাড়পত্রের বিধান রয়েছে। ছাড়পত্র ছাড়া জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ করার সুযোগ নেই। আইনে পরিবেশবান্ধব উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারের কথাও উল্লেখ আছে।
শুধু তাই নয়, পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ প্রচলিত পরিবেশ আইন ও বিধিবিধানও প্রযোজ্য। জাহাজে থাকা বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্ত ও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও জাহাজভিত্তিক বিপজ্জনক পদার্থের তথ্য জানা এবং শ্রমিক ও পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিধি আছে, আইন আছে, বোর্ড আছে, পরিদর্শনের ব্যবস্থা আছে; নেই শুধু যথাযথ প্রয়োগের নিশ্চয়তা। এখানেই মূল সংকট। এ সংকট উত্তরণে সরকারি ব্যবস্থা বা কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা অালোচনায় থাকে না। সবচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয়, এই ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্যও ধোঁয়াশাপূর্ণ।
জাহাজ কাটার আগে জাহাজের প্রতিটি অংশের ঝুঁকি নিরূপণ, গ্যাস ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থমুক্ত করার নিশ্চয়তা, প্রশিক্ষিত শ্রমিক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, গ্যাস শনাক্তকারী যন্ত্র, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসার প্রস্তুতি— এসব কাগজে নয়, বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে এলএনজি, তেল, রাসায়নিক বা অন্য কোনো বিপজ্জনক পণ্য বহনকারী জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। এবারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জাহাজ যথাযথভাবে ‘গ্যাসমুক্ত’ ছিল কি না, সেটি তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয় হওয়া উচিত। বিষাক্ত বর্জ্য বা গ্যাস কোথায় কীভাবে অপসারণ করা হবে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সরকারের উচিত এখনই সীতাকুণ্ডসহ সব জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিশেষ নিরাপত্তা অডিট চালানো। যেসব ইয়ার্ড নির্ধারিত নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ করছে না, সেগুলোর কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা উচিত। শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পুনরায় কাজের অনুমতি দেওয়া যাবে না। শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়; আকস্মিক ও নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন জোরদার করতে হবে।
জাহাজভাঙা বা কাটা শিল্প গড়ে উঠুক, অর্থনীতির চাকা ঘুরুক; কিন্তু সেই চাকার নিচে মানুষের জীবন যেন পিষ্ট না হয়। সীতাকুণ্ডের এ মৃত্যুর দায় নিরূপণ, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিরাপদ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের বাস্তব ব্যবস্থা এখনই নিশ্চিত করতে হবে।






