সম্পাদকীয়
বাঁচাতে হবে পোশাক শিল্প

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্পের হাত ধরেই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছে। বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে লাখ লাখ মানুষের। পরিতাপের বিষয়— যে শ্রমিকের ঘাম, শ্রম ও দক্ষতায় এ শিল্প আজ দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে, সেই শ্রমিককেই নিজের ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাজপথে নামতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আন্দোলনে সংঘর্ষ, ধরপাকড়, কারখানা বন্ধ এবং একজন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা পর্যন্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
গত কয়েক দিনে যা ঘটেছে, তাতে সামনে আসছে দেশের শ্রমনীতি, শিল্পসম্পর্ক, মালিক-শ্রমিক সমঝোতা এবং সরকারের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। শ্রমিকদের দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা। দাবিটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা— সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সবকিছুতে ব্যয় বাড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন বাস্তবসম্মত নয়।
শ্রমিক অসন্তোষ যখন তীব্র আকার ধারণ করেছে, তখন সরকার ছয় সদস্যের একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষের বিষয়টি সরকার আগে থেকেই জানত। তাহলে আন্দোলন তীব্র হওয়ার পরই কেন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিতে হলো? আরও আগে বৈঠক ডাকার সুযোগ ছিল। শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
মালিকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং ক্রেতাদের মূল্যচাপের বিষয়গুলোও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান কি শ্রমিকের মজুরি কম রেখে করতে হবে? মালিকদের মুনাফা ও শ্রমিকের জীবনধারণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মালিকপক্ষ যদি শ্রমিকের ন্যায্য দাবির প্রতি আন্তরিক না হয়, তাহলে শিল্পের স্থিতিশীলতা আশা করা দুরাশা।
শ্রমিক আন্দোলনের নামে কারখানা, যানবাহন কিংবা অন্যের সম্পদ ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। একইভাবে আন্দোলন দমনের নামে নির্বিচার ধরপাকড়, হয়রানি কিংবা শ্রমিক নেতাদের অপরাধ প্রমাণের আগেই অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এ শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে তার অভিঘাত পড়বে জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকায়।
শ্রমিকদের ক্ষোভের পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। এ ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি নাশকতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করে, তাদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। কেউ কেউ অস্থিরতার মধ্যে ষড়যন্ত্র খুঁজছেন। ষড়যন্ত্র থাকলে তদন্ত করা হোক। আবার অরাজকতার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যাহত করে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
পোশাকশিল্প বাঁচাতে হলে শ্রমিককে বাঁচাতে হবে। রপ্তানি আয় রক্ষা করতে হলে শ্রমিকের জীবনমান রক্ষা করতে হবে। মালিকের মুনাফা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবনও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের ঘামে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে আর কোনো শ্রমিকের প্রাণ ঝরুক— এমন পরিস্থিতি আমরা দেখতে চাই না।



