একাকিত্ব চাই না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রবীণদের নিঃসঙ্গতার প্রসঙ্গ এলে প্রথমে পশ্চিমা দেশগুলোর কথাই আলোচনায় আসে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে যৌথ পারিবারিক জীবন থেকে প্রবীণদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনা অনেকটা স্বাভাবিক দেশগুলোতে। তবে বাংলাদেশের চিত্র এদিক থেকে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। একসময় ‘একান্নবর্তী পরিবার’ ছিল দেশের সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কালক্রমে ওই পরিবারগুলো ভাঙলেও ব্যতিক্রম ছাড়া প্রবীণদের কখনো নিঃসঙ্গ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। সোমবার ‘দৈনিক আগামীর সময়’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবীণদের নিঃসঙ্গ জীবনের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘প্লাস ওয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৫১.৫ ভাগ প্রবীণ কোনো না কোনোভাবে একাকিত্ব বা মানসিক নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। এর মধ্যে ঢাকায় প্রবীণদের একাকিত্বের হার বেশি। এই শহরে বসবাসরত প্রবীণদের মধ্যে ৫৭.১ ভাগ একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন। শহুরে অ্যাপার্টমেন্ট কালচার, ব্যস্ত জীবনযাত্রা এবং সামাজিক মেলামেশার অভাব এই নিঃসঙ্গতার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে ঢাকার বাইরে অঞ্চলভেদে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতার হার কিছুটা ভিন্ন বলেই জানা যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট, আবাসন সমস্যা ও আধুনিকায়নের প্রভাবে কয়েক বছর ধরেই ঢাকায় যৌথ পরিবার ভেঙে দ্রুত একক পরিবার গড়ে উঠছে। ঢাকার প্রায় ১৯.৫ শতাংশ প্রবীণ সন্তান ছাড়া শুধু জীবনসঙ্গীকে নিয়ে আলাদা থাকছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে নিঃসঙ্গভাবে মৃত্যুবরণ করা বৃদ্ধ নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধারের ঘটনা এখনো তরতাজা। এ ঘটনা সমাজের প্রবীণদের নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়।
এশিয়ার দেশ জাপানে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা গভীর সামাজিক সংকট। অতিরিক্ত কর্মব্যস্ত জীবন, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাপানে অনেকেই পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা অনেক সময় দেশটিতে এতটাই চরম রূপ নেয় যে অনেক প্রবীণ নিজ বাড়িতে নিঃসঙ্গ অবস্থাতেই মারা যান। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর লাশ উদ্ধারের উদাহরণও রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় জাপান সরকার ‘একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা প্রতিরোধ আইন’ (Loneliness and Isolation Countermeasures Act) প্রণয়ন করেছে। এর পাশাপাশি দেশটিতে ‘মিনিস্টার অব লোনলিনেস’ বা একাকিত্ববিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগসহ বহুমুখী প্রতিরোধমূলক ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সামাজিক পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো, স্থানীয় পর্যায়ে ‘রেসিডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করা। বয়স্ক নাগরিকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এই অ্যাসোসিয়েশনের কাজ, যা ফলপ্রসূ হিসেবে এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি জাপানের মতো নয়। কিন্তু সমাজ প্রতিনিয়তই তার রূপ বদল করছে। ফলে মানুষের মনস্তত্ত্বেরও পরিবর্তন ঘটছে। েয মানুষগুলো বছরের পর বছর পরিবারকে বনস্পতির মতো ছায়া দিয়ে েগছেন, আজ তারা নিঃসঙ্গ। আজ তাদেরই ছায়ার প্রয়োজন। প্রবীণদের নিঃসঙ্গতার কথা উপলব্ধি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদে সম্প্রতি ‘দৈনিক আগামীর সময়’ পত্রিকা ‘গোল্ড ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা চাই, সমাজের সকল স্তরের মানুষ প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। আমরা জাপানের মতো একাকিত্ববিষয়ক মন্ত্রী চাই না।




