সম্পাদকীয়
অমার্জনীয় অবহেলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষ প্রতিদিন যে কয়েকটি পণ্য সবচেয়ে বেশি আস্থা নিয়ে ব্যবহার করে, টুথপেস্ট তার অন্যতম। দিন শুরু হয় দাঁত ব্রাশ দিয়ে, আর সেই নিত্য অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুস্থ জীবনের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই টুথপেস্টেই যদি ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তবে তা শুধু একটি পণ্যের মানগত ত্রুটি নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অবহেলা। দেশে বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার অভিযোগ এবং এ বিষয়ে তদন্তের দাবিতে হাইকোর্টে রিট দায়ের হওয়ার ঘটনা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয়, শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্টেও এ ধরনের উপাদান থাকার অভিযোগ উঠেছে। দেশের বাজারে প্রচলিত জনপ্রিয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৬টি টুথপেস্টে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে— এমন দাবি করেছে ভোক্তা অধিকার ও সচেতনতাবিষয়ক সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটি (সিএসএস)। সম্প্রতি এক গবেষণায় এ তথ্য পেয়েছে সংগঠনটি। এটি সাধারণ কোনো ঘটনা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
হাম ও ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে এ খবর জনস্বাস্থ্যে দুঃসংবাদের বোঝা অারও ভারী করল। টুথপেস্ট প্রতিদিন ব্যবহারের পণ্য। এসব টুথপেস্ট দেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের তৈরি। বহুল পরিচিত কোম্পানির পণ্যে এই ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতির বিষয়টি গতকাল মঙ্গলবার ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি। এ নিয়ে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এমন এক ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা পরিবেশের পাশাপাশি মানবদেহের জন্যও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশ্বে স্বীকৃত। দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্টের কিছু অংশ শিশুদের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা অস্বাভাবিক নয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত পণ্যে এমন উপাদান পাওয়া গেলে তা আরও কঠিন প্রশ্নের জন্ম দেয়। অতিমুনাফার আশায় যদি কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তবে সেটি শুধু ব্যবসায়িক অনৈতিকতা নয়, অপরাধও। চিকিৎসকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মুখের ক্ষতের মাধ্যমে সরাসরি রক্তপ্রবাহে প্রবেশের ঝুঁকিতে থাকে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করলে লিভার, কিডনি ও হরমোনজনিত জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে। তারা কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কাঁচামালের মান যথাযথভাবে পরীক্ষা করেছে? নাকি উৎপাদন ব্যয় কমাতে কিংবা অবহেলার কারণে এমন উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে? ভোক্তার বিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম দায়িত্ব নিরাপদ পণ্য সরবরাহ করা। সেই দায়িত্বে সামান্য বিচ্যুতিও ক্ষমার অযোগ্য। মানুষের মুখে প্রতিদিন ব্যবহৃত একটি পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু জরিমানা নয়; প্রয়োজন হলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ করাসহ ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের প্রতি দায়ও নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বাইরের প্রতিষ্ঠান হলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে।
বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। যে সংস্থাগুলো নিয়মিত বাজার তদারকি, নমুনা পরীক্ষা এবং মান যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করে, তারা এতদিন কী করছিল? এ ভয়ংকর তথ্য উদ্ঘাটিত হলো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ দায় এড়াবে কীভাবে? যদি পরীক্ষা না হয়ে থাকে, তবে সেটি দায়িত্বে চরম গাফিলতি। কাগজ-কলমে মান নিয়ন্ত্রণ আর বাস্তবে ভোক্তার নিরাপত্তা— দুটো এক জিনিস নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস চলতে পারে না। মানুষের আস্থার জায়গাকে বিষাক্ত করে তোলার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নেই। শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা আরও অমার্জনীয়। এ ঘটনায় যদি কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ অনিয়মের পথ খুলে যাবে।




