সম্পাদকীয়
চার দশকেও পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় কেন

পৃথিবীর অন্যতম খরস্রোতা নদী পদ্মা। নদীটি বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে ভিন্ন নামে প্রবাহিত। এর উৎস ভারতে। বাংলাদেশ অংশে পদ্মা ও ভারতে গঙ্গা। এটি অভিন্ন স্রোতোধারায় বহমান। এ নদীর গভীরতাও উল্লেখ করার মতো। গড় গভীরতা প্রায় ৯৬৮ ফুট। এ গভীরতা অবশ্য মৌসুমি প্রবাহের সঙ্গে কমবেশি হয়ে থাকে। এমন একটি নদী বাংলাদেশ অংশে গত চার দশকে আয়তনে নেমে এসেছে অর্ধেকে। ‘আগামীর সময়’-এর গতকাল মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৯৮৪ সালের তুলনায় আয়তন কমেছে ৫০ শতাংশ, পানির গভীরতা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ আর প্রবাহ কমেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। মূলত পানি প্রত্যাহার, নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ জলবায়ু পরিবর্তনে নদীটির প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। নদী রক্ষার অব্যবস্থাপনার কারণে অদূরভবিষ্যতে নদীটি মারা যেতে পারে, এর লক্ষণ রাজশাহী অঞ্চলে এখনই দৃশ্যমান। পানির একটি প্রাকৃতিক উৎস মানুষের হাতেই নিহত হবে, তা মোটেও কাম্য নয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও দেশের অন্যতম প্রধান নদী পদ্মার এ দুর্দশা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
পদ্মার পানিপ্রবাহ হ্রাসের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ উভয়ই দায়ী। তবে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো উজানে পানি নিয়ন্ত্রণ। ১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে অভিন্ন গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়া শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে এই বাঁধের মাধ্যমে পানি আটকে রাখার ফলে বাংলাদেশের অংশে পদ্মার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। অন্যদিকে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার হার পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে উৎসস্থলেই গঙ্গার পানির প্রাপ্যতা কমছে। ফলে এদিকে পদ্মার পানিও কমে যায়। উজানের পানির গতি কমে যাওয়ায় নদীতে প্রচুর পলি ও বালি জমার ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, এতে পানির ধারণক্ষমতা কমছে। নদী ও এর পাড় দখল, নদীদূষণের কারণেও এর আয়তন কমে যাচ্ছে। অাধুনিক প্রযুক্তির ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এ সমস্যা দূর করা সম্ভব।
পদ্মার পানি বণ্টন নিয়ে যে পরিস্থিতি বিদ্যমান তা পানিপ্রবাহ হ্রাসের অন্যতম কারণ। পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণে দুই দেশের মধ্যে প্রায়ই সম্পর্কের টানাপড়েন ঘটে। পদ্মার (গঙ্গা) পানি বণ্টনের বিষয়টি সুরাহার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হতে চলেছে। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী তার কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের পানি পায় না, যার ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং সুন্দরবনের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। রাজশাহীর বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে প্রায় মরুভূমি। পানি বণ্টন চুক্তির শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা ও ফাঁকফোকরগুলো নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করা এখনই জরুরি। যৌথ নদী কমিশনের কার্যকারিতা বাড়াতে তিস্তাসহ অন্য অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টিও সমান্তরালভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। যাতে সামগ্রিক পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
ভারতের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত পানিচুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তরীণ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভর হতে হবে। পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।






