সম্পাদকীয়
ডলারের খেলা আর ‘শর্তের’ অজুহাত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মার্কিন ডলারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আন্তঃব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও খোলাবাজার— সব জায়গাতেই ডলারের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। দেশে ডলারের সংকট নতুন নয়। তবে সংকটের ভেতরেও নতুন সার্কাস চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ‘রেফারেন্স রেট’ নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বড় একটি অংশ তা মানছে না। তারা ইচ্ছামতো দামে ডলার কেনাবেচা করছে। প্রশ্ন ওঠে, দেশে কি আদৌ কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি ডলারের রেট ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকে বা আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধে তা ১২৬ থেকে ১২৭ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ব্যাংক খাতের অভিভাবক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল এই কারসাজির লাগাম টেনে ধরা। কিন্তু অভিভাবক এখন অসহায় দর্শক। তাদের হাত নাকি বাঁধা। আর এই বাঁধার নাম ‘আইএমএফের শর্ত’।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে ডলারের বাজারকে মুক্ত রাখতে। অর্থাৎ, সরবরাহ ও চাহিদার ভিত্তিতে ডলারের দর নির্ধারিত হবে। এই শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুযোগসন্ধানী ব্যাংকগুলো অনৈতিক ব্যবসা ফাঁপিয়ে তুলছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডলার নিয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা লুটছে— এমন অন্তত সাতটি ব্যাংক চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অথচ কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারছে না। শুধু ‘মৌখিক নির্দেশনা’ দেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ঘোলাটে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছুঁইছুঁই। আমদানি ব্যয় হঠাৎ লাফিয়ে বেড়েছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই ডলারের অতিরিক্ত টানাটানি। একই সঙ্গে বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের রেকর্ড বৈদেশিক ঋণ ও সুদের কিস্তি শোধ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ আগে কখনো এক বছরে এত ঋণ শোধ করেনি।
কিন্তু তাই বলে কি অনিয়মকে বৈশ্বিক সংকটের আড়ালে বৈধতা দেওয়া যায়? বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নাকি এখনো পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে। ব্যাংক খাতে ৪০ মিলিয়নের বেশি নগদ ডলার জমা আছে। রেমিট্যান্স প্রবাহও ভালো। তবে কেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ডলার এত দুর্লভ?
প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকগুলো মূলত আইএমএফের ‘মুক্তবাজার’ নীতিকে ঢাল বানিয়ে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কৌশল করে ডলারের বাজারে এই কারসাজি চালিয়ে থাকে: ঘোষিত হারের চেয়ে বেশি দামে ক্রয়; এলসি (LC) খোলার সময় হিডেন চার্জ বা বেশি দর নেওয়া; কৃত্রিম সংকট তৈরি ও ডলার মজুদ; ট্রেজারি অপব্যবহার ও অভ্যন্তরীণ তহবিল লেনদেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি ও আইএমএফের নমনীয় নীতির দোহাই দিয়ে অসাধু ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স ও আমদানির দুই প্রান্তেই ইচ্ছামতো দর হাঁকিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিকে জিম্মি করে নিজেদের মুনাফা বাড়াচ্ছে।
আইএমএফ বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চেয়েছে, বাজার কারসাজির ছাড়পত্র দেয়নি। কোনো ব্যাংক বাজারকে ঘোলাটে করে অস্বাভাবিক মুনাফা লুটবে আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুধু নীরব ভূমিকা পালন করবে— তা কোনো স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতির অংশ হতে পারে না।
অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবিলম্বে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আইএমএফের নাম ভাঙিয়ে ব্যাংকগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বরদাশত করা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা কি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাহারাদার হবে, নাকি অনিয়মকারীদের নীরব অনুঘটক হয়ে থাকবে?




