Agamir Somoy E-Paper
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
রোগীর জন্য রক্ত সংগ্রহে ছোটেন আইয়ুব
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

advertiseadvertise
আগামীর সময় মতামত

উপনিবেশ মরক্কোকে যেভাবে শোষণ করেছে ফ্রান্স ও স্পেন

তানিম ইশতিয়াক
agamir somoy
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৬
উপনিবেশ মরক্কোকে যেভাবে শোষণ করেছে ফ্রান্স ও স্পেন

সংগৃহীত ছবি

আইনগতভাবে মরক্কোকে বলা হতো প্রটেক্টরেট বা রক্ষিত অঞ্চল। স্ত্রীর থাকে অধিকার, রক্ষিতার ভাগ্যে শোষণ। ফ্রান্স ও স্পেনের উপনিবেশে মরক্কোর অবস্থাও ছিল তেমন। দেশটিতে সুলতান ছি, রাজদরবার ছিল, পতাকা ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রের আসল চাবি ছিল ইউরোপীয় শাসকদের হাতে। আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী তাদের আগলে রাখার কথা, কিন্তু বাস্তবে করেছিল লুণ্ঠন।

সময়টা ১৯১২ সাল। স্বাক্ষরিত হয়েছিল ফেজ চুক্তি। তবে গল্পের শুরুটা আরও আগে, উনিশ শতকের শেষ ভাগে। ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আফ্রিকাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছিল। ফ্রান্স ইতোমধ্যে আলজেরিয়া দখল করেছে। তিউনিসিয়াতেও তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। মরক্কো তখন উত্তর আফ্রিকায় স্বাধীনতার শেষ বড় প্রতীকগুলোর একটি। তার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। এক পাশে আটলান্টিক মহাসাগর। অন্য পাশে ভূমধ্যসাগর। জিব্রাল্টার প্রণালি খুব কাছে। ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় প্রবেশের দরজার মতো ছিল দেশটি।

ফ্রান্স মরক্কোকে নিজের উত্তর আফ্রিকান সাম্রাজ্যের অংশ করতে চেয়েছিল। স্পেনেরও ছিল পুরোনো দাবি। দেশটির উত্তরাঞ্চল স্পেনের একেবারে কাছাকাছি। ব্রিটেন, জার্মানি ও ইতালিও মরক্কোর দিকে নজর রাখছিল। তাই মরক্কো শুধু একটি দেশ ছিল না। ইউরোপীয় শক্তির দাবার বোর্ডে এটি ছিল মূল্যবান ঘুঁটি।

মরক্কোর দুর্বল অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংকট ইউরোপীয়দের সুযোগ করে দেয়। বিদেশি ঋণ বাড়তে থাকে। ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও ব্যাংকগুলো অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। ঋণের নামে মরক্কোর আয় ও শুল্কের ওপর বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়। অর্থাৎ সামরিক দখলের আগেই অর্থনৈতিক দড়ি দিয়ে দেশটিকে বেঁধে ফেলা হয়েছিল।

১৯০৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় আলজেসিরাস সম্মেলন। সেখানে বলা হয়েছিল, মরক্কো স্বাধীন থাকবে। কিন্তু দেশটির পুলিশ, ব্যাংক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ফ্রান্স ও স্পেনকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। স্বাধীনতার ঘোষণার আড়ালেই তৈরি হয় পরাধীনতার কাঠামো।

একবছর পর কাসাব্লাঙ্কায় ফরাসি প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়। ফরাসি যুদ্ধজাহাজ শহরে গোলাবর্ষণ করে। সেনারা বন্দরে নামে। সাধারণ মানুষ নিহত হয়। এরপর ধীরে ধীরে দেশের ভেতরে ফরাসি সামরিক উপস্থিতি বাড়ে।

শেষ আঘাত আসে ১৯১২ সালের ৩০ মার্চ। সুলতান আবদুল হাফিজ ফেজ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে মরক্কোর অধিকাংশ অঞ্চল ফ্রান্সের প্রটেক্টরেটে পরিণত হয়। একই বছরের নভেম্বরে আরেকটি চুক্তির মাধ্যমে উত্তর মরক্কোর একটি বড় অংশ স্পেনের হাতে দেওয়া হয়। দেশের দক্ষিণেও স্পেন একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত। তাঞ্জিয়ারকে করা হয় আন্তর্জাতিক অঞ্চল।
মরক্কোর শরীর ভাগ হয়ে গেল। কিন্তু মাথায় তখনও সুলতানের মুকুট। হাত-পা বাঁধা ইউরোপীয় শাসনের দড়িতে।

নামমাত্র সুলতান, আসল শাসক বিদেশি
ফরাসিরা মরক্কোর সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করেনি। কারণ তারা জানত, সুলতানকে সামনে রাখলে শাসন করা সহজ হবে। জনগণ দেখবে তাদের নিজস্ব রাজা আছেন। অথচ বড় সিদ্ধান্ত নেবে ফরাসি রেসিডেন্ট-জেনারেল। সুলতানের নামে আইন জারি হতো। সেই আইনকে বলা হতো ‘দাহির’। কিন্তু অনেক আইন তৈরি করতেন ফরাসি কর্মকর্তারা। সুলতানের কাজ ছিল তাতে স্বাক্ষর দেওয়া।

প্রশাসনের পুরোনো কাঠামোও রাখা হয়েছিল। কায়েদ, পাশা ও স্থানীয় নেতাদের ব্যবহার করা হয় জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য। যারা ফরাসিদের সহযোগিতা করত, তারা পদ, জমি ও সুযোগ পেত। যারা বিরোধিতা করত, তাদের ওপর নেমে আসত সেনাবাহিনী। স্প্যানিশ অঞ্চলেও একই নাটক চলত। তেতুয়ানে সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবে একজন খলিফা থাকতেন। কিন্তু আসল ক্ষমতা ছিল স্প্যানিশ হাই কমিশনারের হাতে। এটাই ছিল পরোক্ষ শাসনের চতুর কৌশল। শাসক বিদেশি। শাসনের মুখ স্থানীয়।

প্রতিরোধের জবাব ছিল কামান
মরক্কোর মানুষ বিনা বাধায় বিদেশি শাসন মেনে নেয়নি। শহর, গ্রাম ও পাহাড়ে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। বিশেষ করে রিফ পর্বত এলাকার মানুষ স্পেনের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াই চালায়। এই প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় নাম আবদ আল-করিম আল-খাত্তাবি। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও সংগঠক। তার নেতৃত্বে রিফের বিভিন্ন গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়।

১৯২১ সালে আনুয়ালের যুদ্ধে রিফ বাহিনী স্প্যানিশ সেনাবাহিনীকে ভয়াবহভাবে পরাজিত করে। হাজার হাজার স্প্যানিশ সেনা নিহত হয়। বহু অস্ত্র রিফ যোদ্ধাদের হাতে আসে। এই জয় ছিল শুধু একটি যুদ্ধের জয় নয়। এটি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির অহংকারে বড় আঘাত।

আবদ আল-করিম রিফ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রশাসন, আদালত, করব্যবস্থা ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ফ্রান্স ও স্পেন কোনো স্বাধীন রিফ রাষ্ট্র মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। দুই উপনিবেশবাদী শক্তি একসঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে। বিপুলসংখ্যক সেনা, বিমান ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
স্পেন রিফ অঞ্চলে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে। বিমান থেকে বিষাক্ত গ্যাসযুক্ত বোমা ফেলা হয়। গ্রাম, কৃষিজমি ও জনবসতি আক্রান্ত হয়। ইউরোপে যে অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন উঠেছিল, আফ্রিকার মানুষের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করতে তাদের দ্বিধা হয়নি।

১৯২৬ সালে আবদ আল-করিম আত্মসমর্পণ করেন। তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। রিফের স্বাধীনতার স্বপ্ন আপাতত থেমে যায়। কিন্তু প্রতিরোধের স্মৃতি মরক্কোর জাতীয়তাবাদকে আরও শক্তিশালী করে।

জমির মালিক কৃষক, কাগজের মালিক উপনিবেশবাদী
ঔপনিবেশিক শোষণের সবচেয়ে গভীর আঘাত পড়ে জমির ওপর। মরক্কোর গ্রামাঞ্চলে অনেক জমি ছিল গোত্র, পরিবার বা গ্রামের যৌথ সম্পত্তি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ এসব জমিতে চাষ করত। কিন্তু তাদের হাতে ইউরোপীয় ধরনের লিখিত দলিল ছিল না।

ফরাসিরা নতুন ভূমি নিবন্ধন আইন চালু করে। জমির মালিকানা প্রমাণ করতে নথি, জরিপ ও সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হয়। দরিদ্র কৃষকরা এই জটিল ব্যবস্থা বুঝত না। তাদের টাকা ছিল না। প্রশাসনে যোগাযোগও ছিল না। অন্যদিকে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী ও কোম্পানির হাতে ছিল অর্থ, আইনজীবী ও প্রশাসনিক সহায়তা। ফলে তারা সহজেই উর্বর জমির মালিকানা পেয়ে যায়। কখনো জমি সরাসরি কেনা হয়। কখনো ঋণের দায়ে কৃষক জমি হারায়। কখনো জমিকে ‘অব্যবহৃত’ ঘোষণা করে রাষ্ট্রের নামে নেওয়া হয়। পরে সেই জমি ইউরোপীয়দের কাছে দেওয়া হতো। শোষণের ভাষা ছিল আইন। ফল ছিল উচ্ছেদ।

১৯৫৫ সালে প্রকাশিত Les Cahiers d’Outre-Mer-এর একটি গবেষণায় বলা হয়, ঔপনিবেশিক প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর চাষ ও চারণভূমি ইউরোপীয়দের (অধিকাংশ ফরাসি) কাছে বিক্রি করেছিল। এটি ছিল মোট উপনিবেশিত জমির প্রায় ২৭–৩০ শতাংশ। সমকালীন সরকারি হিসাবে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণাধীন মোট জমি ছিল আনুমানিক ৯ লাখ থেকে ১০ লাখ হেক্টর।

প্রশাসন শুধু জমি দেয়নি; ইউরোপীয় কৃষকদের ঋণ, প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ এবং সরকারি তত্ত্বাবধানও দিয়েছে। বিপরীতে অধিকাংশ মরক্কান কৃষক ক্ষুদ্র, খণ্ডিত ও প্রথাগত ভূমিতে সীমাবদ্ধ ছিল। উর্বর জমিতে ইউরোপীয় খামার গড়ে ওঠে। সেখানে আধুনিক যন্ত্র, সেচ, ঋণ ও উন্নত বীজের ব্যবস্থা ছিল। এসব খামারে রপ্তানিমুখী ফসল উৎপাদিত হতো। অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরা ছোট ও অনুর্বর জমিতে বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে চাষ করত। অনেকেই নিজের জমি হারিয়ে ইউরোপীয় খামারে শ্রমিক হয়। গতকাল যে মানুষ নিজের জমির মালিক ছিল, আজ সে নিজের মাটিতেই মজুর।

মাটির নিচের সম্পদও বিদেশিদের
মরক্কোর মাটির নিচে ছিল বিপুল খনিজ সম্পদ। ফসফেট ছিল সবচেয়ে মূল্যবান। কৃষিতে সার তৈরির জন্য এই খনিজের চাহিদা ছিল অনেক। ফরাসিরা খুরিবগাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ফসফেট খনি নিয়ন্ত্রণ করে। খনি পরিচালনার জন্য গড়ে তোলা হয় বড় প্রতিষ্ঠান। খনি থেকে বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হয়। কাসাব্লাঙ্কা বন্দর সম্প্রসারণ করা হয়।

উন্নয়নের ছবি দেখা যাচ্ছিল। রেল চলছে। বন্দরে জাহাজ আসছে। খনিতে যন্ত্র চলছে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, এই উন্নয়ন কার জন্য? রেলপথের প্রধান কাজ ছিল খনিজ বন্দরে নেওয়া। বন্দরের কাজ ছিল তা ইউরোপে পাঠানো। লাভের বড় অংশ যেত বিদেশি কোম্পানি ও ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাতে।

স্পেন রিফ অঞ্চলের লোহার খনি নিয়ন্ত্রণ করত। স্প্যানিশ কোম্পানি পাহাড় কেটে লোহা তুলত। রেল ও তারের পরিবহনব্যবস্থায় আকরিক বন্দরে নেওয়া হতো। পরে তা ইউরোপে রপ্তানি করা হতো। মরক্কোর পাহাড় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। শ্রম দিয়েছে মরক্কানরা। সম্পদ গেছে ইউরোপে। সাম্প্রতিক Journal of Agrarian Change গবেষণা দেখায়, ঔপনিবেশিক যুগে মরক্কোর উচ্চমানের ফসফেটের বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে ফ্রান্সের পাশাপাশি ব্রিটিশ সার ও রাসায়নিক কোম্পানিও ছিল।

কর দেবে মরক্কান, সুবিধা পাবে উপনিবেশবাদী
ঔপনিবেশিক সরকার পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন ছিল। এই অর্থের বড় অংশ নেওয়া হতো মরক্কোর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। কৃষকের ফসলের ওপর কর ছিল। গবাদিপশুর ওপর কর ছিল। বাজারে পণ্য কেনাবেচার ওপর কর ছিল। ভোগ্যপণ্যের ওপর কর ছিল। বাড়ি ও ব্যবসার ওপরও কর বসানো হতো। একজন দরিদ্র কৃষক ফসল ফলাত। সেই ফসলের ওপর কর দিত। বাজারে বিক্রি করতে কর দিত। পরে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়েও কর দিত।
সংগৃহীত অর্থ দিয়ে রাস্তা, রেলপথ ও বন্দর নির্মাণ করা হতো। কিন্তু এসব অবকাঠামোর বড় অংশ তৈরি হয়েছিল ইউরোপীয় খামার, খনি ও ব্যবসার সুবিধার জন্য। অর্থাৎ করের বোঝা ছিল স্থানীয় মানুষের কাঁধে। লাভের গাড়ি চলত বিদেশিদের পথে।

কম মজুরির শ্রমিক ছিল মরক্কান
খনি, রেলপথ, বন্দর, নির্মাণকাজ ও ইউরোপীয় খামারে হাজার হাজার মরক্কান শ্রমিক কাজ করত। তারা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করত। কিন্তু ইউরোপীয় শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পেত। একই কাজ। একই সময়। কখনো একই ঝুঁকি। তবু বেতন আলাদা। ইউরোপীয় কর্মচারীরা ভালো বাসস্থান, চিকিৎসা ও সামাজিক সুবিধা পেত। মরক্কান শ্রমিকরা থাকত দরিদ্র এলাকায়। কর্মস্থলের দুর্ঘটনা ছিল সাধারণ ঘটনা। শ্রম আইনের সুরক্ষা ছিল সীমিত। ঔপনিবেশিক অর্থনীতির জন্য মরক্কান শ্রমিক প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদার মূল্য ছিল কম।

শিক্ষার দরজাও ছিল আলাদা
ফ্রান্স মরক্কোয় শিক্ষা বিস্তার করেছিল বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থাতেও ছিল স্পষ্ট বৈষম্য। ইউরোপীয় শিশুদের জন্য ছিল উন্নত স্কুল। ভালো শিক্ষক। আধুনিক পাঠ্যক্রম। উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সুযোগ। মরক্কান মুসলিম শিশুদের জন্য আলাদা স্কুল ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে সীমিত শিক্ষা দেওয়া হতো। উদ্দেশ্য ছিল এমন কর্মী তৈরি করা, যারা নিচু স্তরের সরকারি চাকরি, অনুবাদ বা কারিগরি কাজ করতে পারবে।

ফরাসি ভাষা হয়ে ওঠে প্রশাসন, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার ভাষা। আরবি ভাষাকে ধর্মীয় ও সীমিত শিক্ষার মধ্যে আটকে রাখা হয়। শিক্ষার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক শ্রেণি তৈরি হয়। যারা ফরাসি ভাষা জানত, তারা চাকরি ও ক্ষমতার কাছে যেতে পারত। যারা জানত না, তারা পিছিয়ে পড়ত। স্প্যানিশ অঞ্চলেও একই ধরনের পৃথক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমতা দেওয়া হয়নি।

শহর আধুনিক হলো, মানুষ বিভক্ত হলো
ঔপনিবেশিক শাসনে কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত ও অন্যান্য শহর দ্রুত বদলে যায়। প্রশস্ত রাস্তা, আধুনিক ভবন, বন্দর, বিদ্যুৎ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু শহর ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ইউরোপীয়দের নতুন শহর। সেখানে পরিকল্পিত রাস্তা, সুন্দর বাড়ি, পানি ও নাগরিক সুবিধা ছিল। অন্যদিকে মরক্কানদের পুরোনো শহর, ঘনবসতি ও শ্রমিক এলাকা। গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে মানুষ শহরে আসত। কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান ছিল না। বস্তি গড়ে ওঠে। দারিদ্র্য বাড়ে। একই শহরে দুটি জীবন চলত। একটি ছিল আলোয় ভরা। অন্যটি শ্রম ও বঞ্চনার অন্ধকারে।

ভাগ করো, শাসন করো

ফরাসি শাসন নিজেকে দাসত্ব ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে “সভ্যতার মিশন” হিসেবে প্রচার করত। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, প্রটেক্টরেট মরক্কোয় গৃহদাসত্ব বিলোপের কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি; বরং রাজতন্ত্র ও দাসমালিক অভিজাতদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য বিষয়টি আড়াল ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফরাসি প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য সার্বজনীন সামাজিক সংস্কার ছিল না। বিদ্যমান বৈষম্য যদি ঔপনিবেশিক শাসনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখত, তবে সেটিকে টিকিয়ে রাখাই তাদের কাছে বেশি সুবিধাজনক ছিল।

ফরাসিরা মরক্কোর আরব ও আমাজিগ জনগোষ্ঠীর পার্থক্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে। তারা দাবি করত, আমাজিগ জনগোষ্ঠী আরবদের থেকে আলাদা। তাদের জন্য আলাদা আইন প্রয়োজন। ১৯৩০ সালের তথাকথিত ‘বারবার দাহির’ এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে। কিছু আমাজিগ অঞ্চলে ইসলামী আদালতের বদলে প্রথাগত আদালতের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

ফরাসিরা বলেছিল, তারা স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা করছে। জাতীয়তাবাদীরা দেখেছিল অন্য ছবি। তাদের মতে, এটি ছিল মুসলিম জনগণকে বিভক্ত করার কৌশল। এই ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। মসজিদে দোয়া পড়া হয়। শহরে সভা হয়। তরুণরা সংগঠিত হতে শুরু করে। ফ্রান্স বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই নীতিই জাতীয় ঐক্যের জন্ম দেয়।

শোষণ থেকেই জন্ম নেয় স্বাধীনতার দাবি
প্রথম দিকে মরক্কোর জাতীয়তাবাদীরা সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলেননি। তারা প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার এবং মরক্কানদের অধিকারের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু ফরাসি সরকার এসব দাবি উপেক্ষা করে। অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার ও নির্বাসিত করা হয়।

১৯৪৪ সালের ১১ জানুয়ারি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানানো হয়। সুলতান পঞ্চম মোহাম্মদ ধীরে ধীরে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হন। শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। খনি, বন্দর, রেল ও কারখানায় ধর্মঘট শুরু হয়। ১৯৫২ সালে কাসাব্লাঙ্কায় বড় বিক্ষোভ হয়। ফরাসি পুলিশ গুলি চালায়। বহু মানুষ নিহত ও গ্রেপ্তার হয়।

১৯৫৩ সালে ফরাসিরা সুলতান পঞ্চম মোহাম্মদকে নির্বাসনে পাঠায়। তারা ভেবেছিল, এতে আন্দোলন দুর্বল হবে। ফল হয়েছিল উল্টো। সুলতান তখন শুধু রাজা নন। তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার প্রতীক। শহর ও গ্রামে প্রতিরোধ বাড়ে। সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক চাপও বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৫ সালে সুলতান দেশে ফিরে আসেন। ১৯৫৬ সালের ২ মার্চ ফ্রান্স মরক্কোর স্বাধীনতা স্বীকার করে। ৭ এপ্রিল স্পেনও উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়। চুয়াল্লিশ বছরের প্রটেক্টরেট শাসনের অবসান ঘটে।

স্বাধীনতা এলো, ক্ষত রয়ে গেল
১৯৫৬ সালে মরক্কো স্বাধীন হয়। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের তৈরি সব সমস্যা একদিনে শেষ হয়নি। ফরাসি ভাষা প্রশাসন, ব্যাংক, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষায় শক্তিশালী থেকে যায়। অর্থনীতি তখনো ফসফেট, কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভালো জমির বড় অংশ ধনী গোষ্ঠী ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য রয়ে যায়। শিক্ষায়ও শ্রেণিগত বিভাজন চলতে থাকে।

স্পেন সব অঞ্চল একসঙ্গে ছাড়েনি। ইফনি অঞ্চল মরক্কো ফিরে পায় ১৯৬৯ সালে। আর সেউতা ও মেলিলা এখনো স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাই মরক্কোর স্বাধীনতার গল্প শুধু পতাকা বদলের গল্প নয়। এটি হারানো ভূমি, লুণ্ঠিত খনিজ, বৈষম্যমূলক শিক্ষা, কম মজুরি এবং বিভক্ত সমাজের উত্তরাধিকার বহনের গল্পও।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের পতাকা বদলেছে। শাসক বদলেছে। কিন্তু অর্থনীতির কাঠামো সহজে বদলায়নি। বড় খামার রয়ে গেছে। রপ্তানিনির্ভর কৃষি রয়ে গেছে। বৈষম্য রয়ে গেছে। বহু তরুণের কাছে আজও ইউরোপই স্বপ্নের ঠিকানা। এই কারণেই সেউতার সমুদ্রে হাজার হাজার মরক্কানকে ভাসতে দেখা যায়। তারা শুধু আজকের বেকারত্ব থেকে পালাচ্ছে না। তারা পালাচ্ছে এক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা অসম অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে। উপনিবেশের ইতিহাস শুধু অতীত নয়, সেটিই বর্তমানের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ও গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।

মরক্কোউপনিবেশ
    শেয়ার করুন:
    Advertisement
    advertiseadvertise