হুমায়ূন আহমেদের পোষা ভূত

ইমদাদুল হক মিলন
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বসে আছি নুহাশপল্লীর পুুকুরঘাটে। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। আকাশে ম্লান চাঁদ। আবছায়ামতো জ্যোৎস্না ফুটে আছে। চাঁদের তলা দিয়ে খানিক পরপরই ভেসে যাচ্ছে খণ্ড খণ্ড মেঘ। নুহাশপল্লী ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। কোথাও কোনো মানুষজন নেই। চারদিক নিবিড় হয়ে থাকা গাছপালায় হা হা করছে হাওয়া। ঝিঁঝিঁ ডেকে যাচ্ছে অবিরাম। পুকুরের উত্তরপাড় ঝোপজঙ্গল আর গাছপালায় এমন ভুতুড়ে হয়ে আছে, তাকালেই গা ছমছম করে। আমি এমনিতেই ভূতকাতুরে। হুমায়ূন ভাই তা জানেন। একবার চাঁদ ঢেকে যাওয়ার পর সিগারেট টানতে টানতে বললেন, ‘ভয় পাচ্ছো? তা অবশ্য পাওয়ারই কথা। পুকুরের ওপারকার জঙ্গলে ভূত আছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি।’
শুনে আমার বুকটা ধক করে উঠল। আমি হুমায়ূন ভাইয়ের দিকে একটু চেপে বসলাম।
নুহাশপল্লী তৈরি হওয়ার শুরুর দিককার ঘটনা। ঘরদুয়ার দুয়েকটা তৈরি হয়েছে। ঝোপজঙ্গল পরিষ্কারের কাজ চলছে। সবুজ মাঠখানির চারদিকে লাগানো হচ্ছে দামি দামি ফুলের গাছ। কোথাও কোথাও ঔষধি গাছ। পুকুর কাটা হয়ে গেছে। বাঁধানো ঘাটলাও তৈরি হয়েছে। হুমায়ূন ভাই দু-চারদিন পরপরই সেখানে যাচ্ছেন। কখনো কখনো রাতও কাটাচ্ছেন। আবার কোনো কোনো দিন বিকালে হঠাৎ করে রওনা দিয়ে চলে গেলেন। অনেকটা রাত পর্যন্ত থেকে ফিরে এলেন। সঙ্গে বন্ধুবান্ধব দু-চারজন থাকেই। সেদিন ছিলাম শুধু আমি। রাতে নুহাশপল্লীতেই আমাদের থাকার কথা। সেই প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছি। পৌঁছেছিলাম শেষ বিকালে। হুমায়ূন ভাই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো জায়গাটা দেখিয়েছেন। গজারিগাছে ভর্তি চারদিক। কোথায় কী করবেন, সেই পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছিলেন। তিনি সব সময়ই বড় চিন্তার মানুষ। ছোট কোনো কিছু ভাবতেনই না। ষাট-সত্তর বিঘার বিশাল জমিটিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী পরিমাণ অর্থের দরকার হবে, তা তার মাথাতেই নেই। তবে স্বপ্ন যে তিনি বাস্তবায়ন করবেনই, তা তার দৃঢ় মনোভাব দেখে পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম। একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিলেন আর আমাকে নিয়ে ঘুরছিলেন। তখন নুহাশপল্লীতে তিনজন মাত্র কর্মী। রান্নাঘরে রাতের রান্নার আয়োজন করছে কেউ; কেউ করছে অন্য কাজ। একজন তটস্থ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে অদূরে। স্যার কখন কী আদেশ করেন, তা পালন করার জন্য।
একসময় সেই লোকটির কাছেই এগিয়ে গেলেন হুমায়ূন ভাই। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকটিকে কী কী বলে ফিরে এলেন তিনি। আমাকে বললেন, ‘রাতের খাবার কটায় খাব, বলে এলাম। আমরা এখন গিয়ে পুকুরঘাটে বসব। এখন আর চা খাব না। ওরা জানে, আমার ঘন ঘন চা খাওয়ার অভ্যাস। ওখানে যেন চা নিয়ে না যায়।’
তার পর থেকে আমরা পুকুরঘাটে বসে আছি। টুকটাক গল্পকথার ফাঁকে একসময় তিনি ভূতের কথাটা তুললেন। ভূত এমন এক জিনিস, তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষও ভূতের গল্পকাহিনি শুনতে পছন্দ করে। ওরকম গা ছমছমে পরিবেশে হুমায়ূন ভাই যখন বললেন, পুকুরের উত্তর পাড়টার জঙ্গলে তিনি ভূত দেখেছেন, শুনে ঘটনাটা শুনতে আমার খুবই আগ্রহ হলো। ‘কবে ওখানটায় ভূত দেখলেন হুমায়ূন ভাই?’
‘এই তো কয়েক দিন আগে একবার দেখলাম। পুুকুরের উত্তর দিকটাতে তো জনবসতি নেই। শুধুই ফসলের মাঠ। বহুদূরে গ্রাম। আর আমার এই জমিটাও ছিল বনভূমি। এরকম জায়গায় তো ভূতপ্রেত থাকবেই! সন্ধ্যার পর একদিন একা একা ঘুরছি। হঠাৎ দেখি, ওপারের জঙ্গলটায় দপ করে একবার আগুন জ্বলে উঠল। প্রথমে বুঝতে পারিনি ঘটনা কী! চমকে উঠেছিলাম। কিছুক্ষণ পর আবার দেখি সেই আগুন। তিনবার দেখার পর ভয় পেয়ে ফিরে এসেছিলাম। আজ আর ভয় লাগছে না। সঙ্গে তুমি আছো। দুজন একসঙ্গে থাকলে ভূতপ্রেত তেমন ডিস্টার্ব করে না।’
আশ্চর্য ব্যাপার, তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওপারের জঙ্গলে দপ করে একটু আগুন জ্বলে উঠল। দেখে আমি চমকে উঠব কী, আঁতকে উঠলাম। হুমায়ূন ভাইয়েরও একই অবস্থা। ‘সর্বনাশ, আজও দেখছি সেদিনকার মতো অবস্থা!’
আমি কম্পিত স্বরে বললাম, ‘এদিকে আসবে না তো?’
‘আসতে পারে।’
‘চলুন, তাহলে উঠি।’
‘দাঁড়াও দেখি, আরও দুয়েকবার আগুনটা জ্বলে কিনা।’
ভয়ে আমার তখন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। হুমায়ূন ভাইয়ের একটা হাত শক্ত করে ধরেছি। তিনি ভরসা দেওয়ার স্বরে বললেন, ‘এদিকটায় আসতে দেখলেই দৌড় দেব। চিন্তা কোরো না।’
আরও দুবার আগুনটা আমরা জ্বলতে দেখলাম। আকাশে চলছে আলো-অন্ধকারের খেলা। অন্ধকার হলেই আগুনটা জ্বলে ওঠে। তারপর যে দৃশ্যটা আমি দেখলাম, সত্যি সত্যি আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অবস্থা। গাছের মতো লম্বা একটি ছায়ামানুষ পুকুরের পশ্চিমপাড় ধরে হেঁটে এসে অদূরে দাঁড়িয়েছে। আমি আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার দিতে গেছি, হুমায়ূন ভাই নির্বিকার। আরেকটা সিগারেট ধরালেন। আমি দুহাতে তার বাহু আঁকড়ে ধরে আছি। হুমায়ূন ভাই সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘অনেক হয়েছে নুরুল হক, এবার থামো। মিলন ভয় পাচ্ছে।’
ঘটনার আগামাথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে যে একটি টর্চলাইট ছিল, তাও জানতাম না। ছায়ামানুষটির ওপর তিনি টর্চলাইটের আলো ফেললেন। আমি বিস্মিত চোখে দেখি, মানুষটি তার গা থেকে কালো চাদর সরাচ্ছে। তার এক হাতে বাঁশের লম্বা একটা লাঠি। চাদরটি সে লাঠির মাথায় এমনভাবে বসিয়েছে, সেই লাঠি মাথার ওপর দিয়ে আকাশের দিকে তুললে ভুতুড়ে একটা অবয়ব তৈরি হয়। লোকটির অন্য হাতে টিনের একটা মগ। সেই মগ থেকে কেরোসিনের গন্ধ আসছে।
নুরুল হক নামের লোকটি খুবই আগ্রহী কণ্ঠে হুমায়ূন ভাইকে বলল, ‘আমার অভিনয় কেমুন হইছে, স্যার?’
হুমায়ূন ভাই নির্বিকার স্বরে বললেন, ‘অতি বাজে। যাও, আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করো।’
পুকুরঘাট থেকে উঠে আসতে আসতে ঘটনা হুমায়ূন ভাই আমাকে বললেন। ওই যে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়ানো নুরুল হকের সঙ্গে তিনি কথা বলতে গিয়েছিলেন, তখনই পরিকল্পনাটা সাজিয়ে এসেছেন। হুমায়ূন ভাই মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসতেন। আগেও দুয়েকবার নুরুল হককে দিয়ে এই কাণ্ডটা তিনি করিয়েছেন। নুরুল হক মুখভর্তি করে কেরোসিন নেয়। তারপর মুখের সামনে একটা ম্যাচের কাঠি জ্বালায়। সেই কাঠির ওপর ফুরুক করে কেরোসিন ছিটিয়ে দিলেই দপ করে আগুনটা জ্বলে ওঠে। বাঁশের লাঠি আর কালো চাদরটা থাকে সঙ্গে। এগিয়ে আসার সময় লাঠির মাথায় চাদর মুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে হেঁটে আসে। খুবই সহজ পদ্ধতি। আবছা আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে ওই ভঙ্গিতে হেঁটে এলে লোকটিকে মনে হবে বিশাল কোনো ছায়ামূর্তি। ভয়ের মুহূর্তে মানুষের বাস্তববোধ বিলুপ্ত হয়ে যায়। সামান্য জিনিসকেও অলৌকিক মনে হয়।
ফিরে আসার সময় হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘আমার পোষা ভূতটা কেমন দেখলে?’
এই মহান কথাশিল্পীর সঙ্গে এরকম কত কত স্মৃতি আমার। সেই সব স্মৃতির কথা ভেবে এখনো গভীর আনন্দে ডুবে যাই। তার পরই তার কথা ভেবে চোখে পানি আসে। কত সামান্য মানুষ আশি-নব্বই-একশ বছর বাঁচেন আর হুমায়ূন আহমেদের মতো অসামান্য মানুষটি কত কম বয়সে চলে গেলেন! এই দুঃখ আমরা কোথায় রাখি?







