সমুদ্র এগিয়ে আসে রাখাইনদের বসতি সরে যায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পুতুল রাখাইন যখন শিশু, সমুদ্র ছিল ১ ঘণ্টা হাঁটার দূরত্বে। বড় বোনের সঙ্গে সেখানে যেতে হতো গাছপালা পেরিয়ে। এখন ১০ মিনিটেই পৌঁছানো যায়। মাঝের জমি খেয়ে নিয়েছে সমুদ্র, হারিয়েছে খেলার পরিচিত স্থান।
২০ অক্টোবর টাইমস অব বাংলাদেশে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড দ্য শোরলাইন: দ্য রাখাইনস আনসিন লসেস’ প্রতিবেদন পড়তে গিয়ে তার এই অভিজ্ঞতায় মন আটকে গেল। নিজের শৈশবের পরিচিত উঠানটির কথা ভাবলেই বোঝা যায়, এমন হারানোর মূল্য জমির দামে মাপা কত কঠিন।
একই প্রতিবেদনে লক্ষ্মীপাড়ার ছোটেন রাখাইন জানিয়েছেন, একসময় সেখানে ৬০টি রাখাইন পরিবার ছিল, এখন আছে পাঁচটি। উৎসব আয়োজনের মানুষ কমেছে। কমেছে সম্মিলিত খরচ বহনের সামর্থ্য। পরিবারের সংখ্যা কমার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের এই ক্ষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি পাড়ায় পাশাপাশি থাকার মধ্য দিয়ে যে সহযোগিতা গড়ে ওঠে, ছড়িয়ে পড়া পরিবারগুলোর পক্ষে দূর থেকে তা ধরে রাখা কঠিন।
ঘর ভাঙলে নির্মাণব্যয় হিসাব করা সম্ভব। ফসল নষ্ট হলে বাজারদর ধরে ক্ষতির অঙ্ক নির্ধারণ করা যায়; কিন্তু মাতৃভাষায় গল্প বলার সঙ্গী কমে যাওয়া, শিশুর সঙ্গে প্রবীণের যোগাযোগ ছিন্ন হওয়া, পরিচিত উৎসবে অংশ নিতে না পারার ক্ষতি কোন ঘরে লেখা হবে? জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি সংস্কৃতি হারানো ও বাস্তুচ্যুতিকে এমন ক্ষয়ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার পরিমাণ টাকার অঙ্কে সহজে হিসাব করা যায় না। বাংলাদেশের পুনর্বাসন পরিকল্পনাতেও সেই বিবেচনা যুক্ত করা জরুরি।
তবে রাখাইনদের বসতি ছাড়ার সব কারণ সমুদ্রের ওপর চাপালে মানুষের তৈরি চাপগুলো আলোচনার বাইরে থেকে যাবে। গত ২২ জুন দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের প্রতিবেদনে কুয়াকাটায় জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, দখলের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা এবং পুনর্বাসনের বিলম্বের কথা এসেছে। সেখানে প্রশাসনের একজন কর্মকর্তাও জাল দলিলে জমি দখলের চেষ্টায় প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার কথা বলেছেন। ফলে ভাঙন ঠেকানোর প্রকল্প দিয়ে জমি দখলের প্রতিকার সম্ভব হবে না। মানুষকে কোন পরিস্থিতিতে বসতভিটা ছাড়তে হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কোথায় তীরভাঙন বসতি সরিয়েছে, কোথায় জীবিকার অভাবে মানুষ সরে যাচ্ছে, কোথায় দখলের অভিযোগ রয়েছে, তার পৃথক অনুসন্ধান প্রয়োজন। অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সঠিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়ও নির্দিষ্ট করা সহজ হবে।
ঘর ভাঙলে নির্মাণব্যয় হিসাব করা সম্ভব। ফসল নষ্ট হলে বাজারদর ধরে ক্ষতির অঙ্ক নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু মাতৃভাষায় গল্প বলার সঙ্গী কমে যাওয়া, শিশুর সঙ্গে প্রবীণের যোগাযোগ ছিন্ন হওয়া, পরিচিত উৎসবে অংশ নিতে না পারার ক্ষতি কোন ঘরে লেখা হবে?
পুনর্বাসনের সাফল্য শুধু কতটি ঘর তৈরি হলো, তা দিয়ে মাপা যাবে না। পরিবারগুলো সেখানে নিরাপদে থাকতে, জীবিকা চালাতে ও নিজেদের ভাষায় সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে কি না, তা জানতে হবে। পরিচিত পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে শিশু দেখাশোনা, অসুস্থের সেবা ও বিপদে সাহায্য পাওয়া কঠিন হয়। নতুন বসতির অবস্থান, জমির নিরাপত্তা, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং উপাসনা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জায়গা নিয়ে আগেই আলোচনা প্রয়োজন। শুধু প্রভাবশালীদের সম্মতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না।
মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন সেই ভাষায় কথা বলা, পড়া ও লেখার সুযোগ থাকা জরুরি। পুনর্বাসিত রাখাইন পরিবারের শিশুদের জন্য নিজেদের বসতিতে মাতৃভাষা শেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এজন্য রাখাইন সম্প্রদায়ের আগ্রহী মানুষের শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ এবং শিশুদের বয়স অনুযায়ী রাখাইন ভাষার বই ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা প্রয়োজন। প্রবীণদের গল্প, গান ও জীবনকথা তাদের সম্মতিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তবে রেকর্ড রাখা আর ভাষায় কথা বলার পরিবেশ গড়া পৃথক কাজ। শিশুরা যেন নিজেদের ভাষায় কথা বলে খেলতে পারে এবং নিজ সম্প্রদায়ের প্রবীণদের কাছে গল্প শুনতে পারে, সেজন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ তৈরিতে শিক্ষা ও সংস্কৃতি দপ্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জীবিকার পরিকল্পনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁতপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সরাসরি বিক্রির সুযোগ এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পরিবারকে আয় ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পর্যটনের ব্যবসায় রাখাইনদের অংশগ্রহণ বাড়াতে স্থানীয় উদ্যোগের জন্য দোকান ও বিপণনের সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে পছন্দমতো অনুষ্ঠান করার চাপ যেন তাদের উৎসবের নিজস্বতা বদলে না দেয়। কোন সাংস্কৃতিক আয়োজন প্রকাশ্যে হবে, তার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মানুষের হাতেই থাকা প্রয়োজন। ক্ষয়ক্ষতির জরিপেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। হারানো জমির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন পরিবার, বন্ধ হওয়া সামাজিক আয়োজন এবং ভাষা চর্চার কমে আসা সুযোগের তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। এই তথ্য সংগ্রহে ব্যক্তিগত স্মৃতি প্রকাশের সম্মতি নিতে হবে। সহায়তা পেতে কাউকে নিজের বেদনা প্রদর্শন করতে বাধ্য করা অনুচিত। পুনর্বাসনের বরাদ্দ, কাজের সময়সীমা ও অভিযোগের নিষ্পত্তির অগ্রগতি প্রকাশ পেলে পরিবারগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে।
দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিতে থাকা বসতিগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিবারগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পাবে। শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় স্থানান্তর ঘটলে জমির কাগজপত্র হারানো, পড়াশোনা বন্ধ হওয়া এবং কাজ ছেড়ে দেওয়ার ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। আগাম প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ প্রয়োজন। পুতুলের হারানো খেলার স্থান ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বসতি, নিজের ভাষায় বড় হওয়ার পরিবেশ এবং পরিচিত মানুষের সান্নিধ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
সমুদ্র এগিয়ে আসার সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক জীবনও যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে না পড়ে, রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সেই দায় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকারকর্মী



