ট্যাক্স স্বস্তি না শাস্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়াকারক ও স্বাক্ষরকারী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ১৭৮৯ সালে এক পত্রে তার এক ফরাসি বন্ধুকে বলছিলেন, ‘... in this world, nothing is certain except death and taxes.’ বর্তমানে বিশ্বের কোনো দেশই শুধু পুলিশ রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে না; জনসাধারণের জীবনমানের উন্নয়ন সাধন ও বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে আনয়ন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এসব কাজের জন্য কর আরোপের মাধ্যমে সম্পদ আহরণের গুরুত্বকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার উপায় নেই।
অর্থ উপার্জন করা অবশ্যই শ্রমসাধ্য কাজ। কষ্টার্জিত সেই অর্থের একটি অংশ কর হিসেবে পরিশোধ করতে গেলে পরিশোধকারীর মনে এক নিদারুণ পীড়নের সৃষ্টি হয়। তার ওপর এ দেশে যারা নিয়মিতভাবে কর দেন না, তাদের তেমন কোনো শাস্তি পেতে দেখা যায় না; বরং মাঝেমধ্যে অনেক সহজ শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। আর যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের জন্য কোনো প্রণোদনা তো নেইই; বরং তাদের কর পরিশোধ করতে হয় ,
আইএমএফের সঙ্গে যে ঋণচুক্তি হয়েছে, তার শর্তাধীনে সামনের বছর দেশে কর-জিডিপি অনুপাত কমপক্ষে ৯.২-এ উন্নীত করার কথা; কিন্তু এটি এখন ৬ থেকে ৭-এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমান সরকারের আগামী বাজেট প্রস্তুতি নিয়ে যেসব কথা শোনা যাচ্ছে, তাতে ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে। এবার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্থলে জায়গা করে নিচ্ছে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো। এর অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে -—,‘’‘’,
কর আদায়ে অযথা হয়রানি বন্ধে একটা প্রস্তাব রাখতে চাই। যেসব কর কর্মকর্তা কর আদায় ও কর নথি নিরীক্ষা করেন, তাদের কর নথি নিরীক্ষা কারা করেন, তা জানি না
এ বছর কমবেশি ৫০ লাখ আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৭১ হাজারের মতো নথি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচন করে নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাঁধা গাভীর একই ওলান থেকে বারবার দুধ দোহন করার এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত কর্তৃপক্ষের রাজস্ব কতটুকু বাড়বে, সেটি অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু এতে অনেক শিষ্ট করদাতারা যে হয়রানির শিকার হবেন, তাতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। কষ্ট করে যাচাই-বাছাইয়ের পর যদি কোনো কিছুই না পাওয়া যায়, সেটি তো ,
একটা বিকল্প হতে পারে সরেজমিন কর জরিপকরণ। নমুনা হিসেবে কয়েকটি সম্ভাবনাময় এলাকা নির্বাচন করে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কর কর্মকর্তা, পুলিশ ও স্থানীয় সরকারের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি এ কাজ করতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া সম্পত্তি, কম দেখানো আয়, হিসাবের গোঁজামিল, বাস্তবে যাচাইকরণ— সবই সম্ভব হতে পারে। নমুনা এলাকায় গৃহীত ব্যবস্থা বাকি অঞ্চলগুলোর জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে বাধ্য।
সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার করের কথা শোনা যাচ্ছে। এতদিন সারচার্জ আদায় করা হতো। সমাজে বৈষম্য হ্রাসকরণ ও সম্পদ অনুৎপাদনশীল খাত থেকে গতি পরিবর্তন করে উৎপাদনশীল খাতে নিয়োজিত করতে এর ভূমিকা ছিল সমুদ্রে শিশির বিন্দুর মতো। এটি যুগোপযোগী করার সময় এসে গেছে। পূর্বপুরুষদের অঢেল সম্পদ অনেক সময় উত্তরপুরুষদের মধ্যে একশ্রেণির নিষ্কর্মা পরজীবী প্রজন্ম গড়ে তুলতে রসদ হিসেবে কাজ করে।
করের আওতা বাড়াতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খুচরা ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদেরও কর-জালের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এমনকি রাইড শেয়ারিং গাড়ি, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশাও করের আওতায় আনা দরকার। তবে এদের কর হতে হবে আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। আয়ের ওপর ধার্য করের সুবিধা হলো এটি দাতাকে সচেতন করে তোলে। মানুষ তার প্রদত্ত কর সরকার কী কী কাজে ব্যবহার করছে, তা জানতে চায়। শোনা যাচ্ছে, এখন থেকে নাকি
কর প্রদানে ভোগান্তি বন্ধ করতে অটোমেশন এক অব্যর্থ দাওয়াই। রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এই অটোমেশনের কথাই বারবার বলছেন। আমি নিজেও সেটি বিশ্বাস করি। কিন্তু কেন যে আমার ভাগ্য খারাপ হলো, বুঝতে পারলাম না। আমার যে সামান্য আয়, তার সবকিছুর রেকর্ড ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট। অবসর গ্রহণের পর একটা ছোট গাড়ি কিনেছিলাম। কেন যে কিনেছিলাম, সেটি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। ঢাকায় গাড়ি করে কোথাও যাওয়ার চেয়ে পদব্রজে যাওয়াই সহজ, সুবিধাজনক, স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী।
কর আদায়ে অযথা হয়রানি বন্ধে একটা প্রস্তাব রাখতে চাই। যেসব কর কর্মকর্তা কর আদায় ও কর নথি নিরীক্ষা করেন, তাদের কর নথি নিরীক্ষা কারা করেন, তা জানি না। আমার প্রস্তাব হলো, দেশের সর্বোচ্চ করদাতাদের মধ্য থেকে চার বা পাঁচ হাজার করদাতার একটি প্যানেল করা, যেখান থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে তিন-চারজনের একটি করে টিম গঠন করা। এই টিম কর কর্মকর্তাদের আয়কর নথি পর্যায়ক্রমে নিরীক্ষা করবে। এতে উভয় পক্ষ পরস্পর পরস্পরের
পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই। আমাদের দেশে করের হার প্রগতিশীল; যার যত বেশি আয়, তার জন্য করহার তত বেশি। কিন্তু দরিদ্র মানুষের ভোগ প্রবণতা বেশি, আবার ধনী ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারীদের বিনিয়োগ প্রবণতা বেশি। বৈষম্য দূর করার নামে সক্ষমদের পুঁজি তছরুপ করে নিলে laissez faire অর্থনীতিতে বিনিয়োগে ভাটা পড়া অবশ্যম্ভাবী; কর্মাভাব তখন নিশ্চিত। সমতাবাদী উন্নত ও সৃজনশীল সমাজ বিনির্মাণে কোনো এক পক্ষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়া চলবে না; একটা ভারসাম্য
লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট




