ভারতেও কি জেন-জিরা বদলে দেবে রাজনীতির হিসাব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি প্রজন্ম ঠিক কখন রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে? যখন তাদের সামনে ভবিষ্যতের দরজাগুলো পদ্ধতিগতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যখন প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি ও প্রাত্যহিক বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয় অথবা যখন তারা তীব্রভাবে অনুভব করে— তাদের কথা শোনার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর আর অবশিষ্ট নেই।
এ প্রেক্ষাপটে এখন ভারতের দিকে তাকিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে— বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশেও কি তেমন কোনো গণঅভ্যুত্থানের জমি প্রস্তুত হচ্ছে? নাকি জেন-জি প্রজন্মের এ ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ, ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ আর মিমনির্ভর ডিজিটাল উত্তেজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক পালাবদলের পেছনের সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘আরাগালায়া’ (সংগ্রাম) আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা। জ্বালানিহীনতা, বিদ্যুৎ সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির মতো বাস্তব উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজাপাকসে পরিবারের স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। তরুণদের সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কিং সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছিল, যার পরিণতিতে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ছিল আরও প্রত্যক্ষ ও রক্তাক্ত। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৈষম্য, পুলিশি নির্মমতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাবের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে নেপালে জেন-জি আন্দোলনের অনুঘটক ছিল মূলত সরকারের সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কিন্তু এর গভীরে সুপ্ত ছিল রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্র, সীমাহীন দুর্নীতি ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে তরুণদের দীর্ঘদিনের হতাশা।
এই তিনটি দেশের ঘটনা কাঠামোগতভাবে আলাদা হলেও একটি জায়গায় তারা অভিন্ন— তরুণদের ক্ষোভ কোনো এক দিনে তৈরি হয়নি। সমাজবিজ্ঞানী জেইনেপ তুফেকসি তার ‘টুইটার অ্যান্ড টিয়ার গ্যাস’ তত্ত্বে যেমনটি দেখিয়েছেন, নেটওয়ার্কযুক্ত প্রতিবাদ একটি নির্দিষ্ট স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় থাকে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই স্ফুলিঙ্গকে দাবানলে পরিণত করে ঠিকই; কিন্তু এর মূল জ্বালানি আসে বাস্তব জীবনের বঞ্চনা থেকে।
ভারতের ক্ষেত্রে এ বঞ্চনার পরিসংখ্যানটি বেশ উদ্বেগজনক। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (ILO) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ভারতের মোট কর্মহীনের মধ্যে এক বিশাল অংশই শিক্ষিত তরুণ। অর্থাৎ যে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশের স্বপ্ন ভারতকে গ্লোবাল পাওয়ার হাউজ বানানোর কথা ছিল, কর্মসংস্থানের অভাবে তা ক্রমে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টারে’ রূপ নিচ্ছে। ভারতের সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলনের নিজস্ব একটি বাঁক তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানহীনতার বিরুদ্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামে পরিচিত তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায়। ইনস্টাগ্রাম রিল, মিম, ডিসকর্ড সার্ভার এবং এক্সের (সাবেক টুইটার) #PaperLeakSarkar বা #YouthDemandsJustice-এর মতো ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগগুলো প্রথাগত মিডিয়ার সেন্সরশিপ এড়িয়ে লাখ লাখ তরুণের কাছে পৌঁছে যায়। এর চাপে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা প্রমাণ করে, এই ডিজিটাল অ্যাকটিভিজম শুধু ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর বাস্তব রাজনৈতিক আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
তিনটি দেশের ঘটনা কাঠামোগতভাবে আলাদা হলেও একটি জায়গায় তারা অভিন্ন— তরুণদের ক্ষোভ কোনো এক দিনে তৈরি হয়নি
অধিকন্তু, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) নিয়ে সম্প্রতি যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা আন্দোলনকে আরও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ১২ অক্টোবর, ২০২৬-এ দিল্লিতে বিরোধী দল ও ছাত্রদের বিক্ষোভে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি ওঠে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া হলেও তরুণদের সন্দেহ— এর মাধ্যমে সুকৌশলে জেন-জি এবং বিরোধী মতাবলম্বী ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়। ভারতের ছাত্র আন্দোলনগুলো এখন আর শুধু শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে সম্প্রসারিত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আশুতোষ ভার্শনে সম্প্রতি যথার্থই পর্যবেক্ষণ করেছেন, ভারতের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনকে শুধু সাময়িক বা দলীয় রাজনীতির বাইনারি দিয়ে বিচার করলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য বোঝা যাবে না। গণতন্ত্রে শুধু ভোটাধিকার থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই অধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নাগরিকের আস্থা থাকাটা তার চেয়েও বেশি জরুরি।
তবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের পরিস্থিতিকে বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সরাসরি সমান্তরালে ফেলা অবৈজ্ঞানিক হবে। ভারতের অর্থনীতি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, রাজ্যভিত্তিক রাজনীতির বৈচিত্র্য এবং ফেডারেল কাঠামো অনেক বেশি জটিল ও স্থিতিস্থাপক (Resilient)। এখানে জনঅসন্তোষ প্রশমনের জন্য ব্যালট বাক্সের একটি শক্তিশালী ‘সেফটি ভাল্ভ’ রয়েছে, যা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও দৃশ্যমান হয়েছিল, যেখানে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে জোট সরকারের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছিল। তা ছাড়া ধর্ম, জাতপাত, ভাষা ও আঞ্চলিক পরিচয়ের যে গভীর বিভাজন ভারতীয় সমাজে রয়েছে, তা অনেক সময় তরুণদের একটি অভিন্ন, প্যান-ইন্ডিয়ান রাজনৈতিক কর্মসূচির অধীনে একাট্টা হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভারতের জেন-জি আন্দোলনের সামনে আসল পরীক্ষা শুধু রাস্তায় নেমে বা ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ দিয়ে সরকার পতনের ডাক দেওয়া নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তোলা। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ক্ষোভকে দ্রুত ভাইরাল করতে পারে; কিন্তু তা কোনো টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প তৈরি করে না। তার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট পলিসিভিত্তিক দাবি, ধারাবাহিক সংগঠন এবং অর্জিত সাফল্যকে নীতিগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
ভারতের জেন-জি ঠিক কোন পথে হাঁটবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে আন্দোলন যদি শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভ বা কয়েকটি দাবির মধ্যে আটকে না থেকে কর্মসংস্থান, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির প্রশ্নে বৃহত্তর জনসমর্থন তৈরি করতে পারে, তবে তা ভারতীয় রাজনীতির ব্যাকরণ চিরতরে বদলে দিতে পারে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক



