কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণমাধ্যমের বিস্তৃতি আজ অভূতপূর্ব। সব মিলিয়ে তথ্যপ্রবাহের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বদলে গেছে সংবাদ গ্রহণ ও প্রচারের ধরনও। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট বণ্টন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। লাইক, শেয়ার, ভিউ কিংবা সাবস্ক্রিপশননির্ভর এই ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় সংবাদ ও কনটেন্টের চরিত্রও বদলে যাচ্ছে। ভুয়া তথ্য, গুজব, রাজনৈতিক মেরূকরণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই এখন প্রশ্নটি শুধু ‘গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন’ তা নয়; বরং এই স্বাধীনতা নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় কতটা কার্যকর— সেটিই মূল বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ স্বাধীনতা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। রাজনৈতিক চাপ, বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনীতি, মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট আইন, অনলাইন ট্রলিং এবং সামাজিক চাপ— সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা এখন জটিল বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নাগরিকও প্রশ্ন তুলছেন— ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে কী করা যাবে?
‘সবার আগে সংবাদ’, ‘লাইভ আপডেট’ কিংবা ‘ফটোকার্ড’ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সত্য, নিরপেক্ষ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্যের পরিবর্তে গুরুত্ব পাচ্ছে দ্রুততা ও চটকদার উপস্থাপন। ক্লিকবেইট শিরোনাম, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক যাচাইবিহীন কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে গুজবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কখনো কখনো মূলধারার কিছু গণমাধ্যমও যথাযথ যাচাই ছাড়া এসব তথ্য প্রচার করে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। এখানেই জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে আসে। কোনো সংবাদে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অধিকাংশ গণমাধ্যমেই অভিযোগ নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট ও কার্যকর অভ্যন্তরীণ কাঠামো নেই। তবে এ ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক অভিযোগ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নাগরিকই জানেন না যে এমন প্রতিকার ব্যবস্থা রয়েছে। অনেকের কাছেই অভিযোগের প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব সীমিত।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোতেও নাগরিকের জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। কোনো সংবাদে মানহানি ঘটলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৫০০ ধারায় প্রতিকার চাওয়া যায়। মানহানিকর কিছু মুদ্রণ বা খোদাই করা হলে ৫০১ ধারা এবং তা বিক্রি বা প্রচার করা হলে ৫০২ ধারায় প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আওতায় ক্ষতিপূরণ ও মানহানির মামলা করার সুযোগও আছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক বা মানসিক ক্ষতির প্রতিকার চাইতে পারেন।
এখন প্রশ্নটি শুধু ‘গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন’ তা নয়; বরং এই স্বাধীনতা নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় কতটা কার্যকর— সেটিই মূল বিবেচ্য হয়ে উঠেছে
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট আইন কিংবা দেওয়ানি আইনের আওতায়ও প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। সাইবার স্পেসে জালিয়াতি, অনলাইন হয়রানি, মিথ্যা তথ্য প্রচার কিংবা ডিজিটাল প্রতারণার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৩-এ নাগরিক সুরক্ষার বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে। তবে বাস্তব সমস্যা হলো— আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় ও জটিলতার কারণে অনেক নাগরিকই প্রতিকার পাওয়ার আগেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন।
নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর একটি হলো তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯। সাংবাদিকরা যেমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ আইন ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি সাধারণ নাগরিকও সরকারি সেবা, উন্নয়ন প্রকল্প বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য চাইতে পারেন। নির্ধারিত পদ্ধতিতে তথ্য চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনানুগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তা নিষ্পত্তি করতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন বা বিলম্ব করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাব এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের অনীহার কারণে আইনের কার্যকারিতা এখনো সীমিত।
বর্তমানে মোবাইল ফোন এখন বহু মানুষের প্রধান সংবাদমাধ্যম। অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক লাইভ— সব মিলিয়ে সংবাদপ্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত, তাৎক্ষণিক ও বহুমাত্রিক। এতে নাগরিক সাংবাদিকতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর সামাজিক নজরদারিও বেড়েছে। তবে এই পরিবর্তনের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ভিউ ও এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতায় তথ্যের গুণগত মান কমে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবেদনশীল বিষয়ে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, অনেক সময় সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সত্য ও মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন সংকটও তৈরি করেছে। এখন এআইর মাধ্যমে মুহূর্তেই একজন ব্যক্তির ছবি বা কণ্ঠ ব্যবহার করে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে, যা নির্বাচনী রাজনীতি, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা ব্যক্তিগত মানহানির ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে— ভুল তথ্য ছড়ালে কোন প্রতিষ্ঠান জবাবদিহি করবে? একজন নাগরিক কীভাবে বুঝবেন কোনটি বাস্তব আর কোনটি কৃত্রিমভাবে তৈরি?
এ বাস্তবতায় মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম-সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। নাগরিককে জানতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কোন সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য এবং ভুয়া খবর শনাক্ত করার উপায় কী। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের তথ্য যাচাইয়ের মানদণ্ড আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভুল সংবাদ প্রকাশ হলে দ্রুত সংশোধনী প্রকাশ, দুঃখ প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং কোথায় ও কেন ভুল হয়েছে, তার স্বচ্ছ পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
লেখক: সরকারি কর্মকর্তা ও লেখক


