সৌদি-হুতি সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী

রাজতন্ত্রের দেশ সৌদি আরবে রাজপরিবারই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এই রাজপরিবারে ১৯৮৫ সালে জন্ম মোহাম্মদ বিন সালমানের। ২০১৫ সালে তার বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজ রাজসিংহাসনে বসলে রাজনীতি ও ক্ষমতার মসনদে মোহাম্মদ বিন সালমানেরও অভিষেক ঘটে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছাড়াও তিনি ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হন। দুই বছরের মাথায় তিনি ক্রাউন প্রিন্স হন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত মোহাম্মদ বিন সালমানই সৌদি আরবে কার্যকর ক্ষমতার অধিকারী। ২০২২ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদও অলংকৃত করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবকেন্দ্রিক রাজনীতি বুঝতে হলে মোহাম্মদ বিন সালমানের দিকে তাকাতে হবে। তিনি আধুনিক, রাজনৈতিকভাবে উদারপন্থী; কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্নে স্বৈরতান্ত্রিক। তিনি মেয়েদের ভোটাধিকার দিয়েছেন, গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছেন, পরীক্ষার হলে বোরকা পরিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। সৌদি আরবকে তিনি বিশ্ব পর্যটন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র বানাতে চেয়েছেন। সৌদি ফুটবলে তিনি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোসহ বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের সমবেত করেছেন। ২০৩৪ সালে সৌদি আরব বিশ্ব ফুটবলের আয়োজক হতে যাচ্ছে। বিশ্বসংগীত কনসার্টের জন্যও তিনি সৌদি আরবকে প্রমোট করতে চাইছেন। তিনি রুশ ভদকা ব্যবসায়ী ইউরি শেফলারের কাছ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যে ইয়ট কিনছেন, ৪৫০ মিলিয়নে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির পেইন্টিং কিনছেন, আবার ৩০০ মিলিয়নে ফরাসি সম্রাট লুই চতুর্দশের প্রাসাদ কিনছেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ছেলের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক উষ্ণ করছেন, তেমন ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও সখ্য এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করতে পারছেন। তার নির্দেশে সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটের ভেতর নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ আছে, কুখ্যাত জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গেও তার সখ্যের অভিযোগ আছে।
মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবকে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কেন্দ্রে দেখতে চেয়েছেন। ফলে আশপাশের দেশগুলোতে বিভিন্ন সময় তার প্রভাব পড়েছে। তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইয়েমেনের শিয়া প্রভাবিত জায়েদি মুসলমান গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের দূরত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৯০-এ বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের পতনের পর দুই ভাগে বিভক্ত উত্তর ইয়েমেন ও কমিউনিস্ট প্রভাবিত দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। উত্তর ইয়েমেনের প্রসিডেন্ট আবদুল্লাহ সালেহ একীভূত ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন। দুই ইয়েমেন এক হলেও দক্ষিণ অংশে কমিউনিস্ট ভাবাপন্নরা নিঃশেষিত হয়নি। ফলে তারা প্রেসিডেন্ট সালেহকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জ করে যেত। এই চ্যালেঞ্জ থেকে বাঁচার জন্য প্রেসিডেন্ট সালেহ মিসর থেকে বিতাড়িত ইসলামিক জিহাদিদের সঙ্গে আঁতাত করেন। আল-কায়েদা গ্রুপও ইয়েমেনে আশ্রয় পায়। জায়েদি মুসলমান জনগোষ্ঠী তখন তাদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুতির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। ইসলামিক জিহাদি এবং আল-কায়েদার প্রভাবে এই জনগোষ্ঠী সশস্ত্র পথ বেছে নিতে থাকে। ২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় আরব স্প্রিং শুরু হলে তার ঢেউ ইয়েমেনে এসে পড়ে। সালেহর ওপর বোমা হামলা করা হয়। ফলে তিনি গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের দেওয়া রোডম্যাপ অনুযায়ী ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু ক্ষমতা ভোগ করার অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। ফলে হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলান। সালেহর বিরুদ্ধে আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শেষ বয়সে এসে তার সঙ্গে হুতিদের মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি রিয়াদ প্রস্তাবিত শান্তিকাঠামোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু হুতিরা তাকে হত্যা করে এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আরও কট্টর পথ বেছে নেয়। তারা ইয়েমেনি সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে ইয়েমেনের পশ্চিম দিকে বিশাল অঞ্চল নিজেদের আওতায় নিয়ে আসে। আবদুল্লাহ সালেহর হত্যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তার নির্দেশে সৌদি সেনাবাহিনী ইয়েমেনি সরকারকে সহায়তার নামে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে হুতি নেতাদের বহনকারী ইরানি বিমানকে ভূপাতিত করে সৌদি আরব হুতিদের জাগিয়ে দিয়েছে। ওই বিমানে হয়তো ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের বিশেষজ্ঞ বা সামরিক উপাদান ছিল। হুতিরা প্রতিশোধ হিসেবে সম্প্রতি রিয়াদ বিমানবন্দরে উপর্যুপরি হামলা চালিয়েছে। দুজন বাংলাদেশিও নিহত হয়েছেন
মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈশ্বিক অ্যামবিশন গত এক যুগে অনেকখানি সফল হয়েছিল। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য— এমনকি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করেছিল। তুর্কিয়ে, কাতার এবং ইরানের সঙ্গেও মতপার্থক্য কমিয়ে এনেছিল। আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ না দিলেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতের পথ এড়িয়ে চলছিল। কিন্তু পাশাপাশি ইয়েমেন ও সিরিয়ার সংঘাতে পক্ষ নেওয়ায় ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। একেবারে নিজের সীমান্তে হুতিদের সঙ্গে বৈরিতা সৃষ্টি করায় সংকটে পড়েছে। ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব সীমিত করতে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত একযোগে কাজ করছিল। গত বছরের শেষে আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের দূরত্ব বাড়ে। তখন থেকে আমিরাত একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধেও হুতিরা সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। কিন্তু আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে হুতি নেতাদের বহনকারী ইরানি বিমানকে ভূপাতিত করে সৌদি আরব হুতিদের জাগিয়ে দিয়েছে। ওই বিমানে হয়তো ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের বিশেষজ্ঞ বা সামরিক উপাদান ছিল। হুতিরা প্রতিশোধ হিসেবে সম্প্রতি রিয়াদ বিমানবন্দরে উপর্যুপরি হামলা চালিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে অন্যদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশিও নিহত হয়েছেন।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নাকি মোহাম্মদ বিন সালমান কয়েকবার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন এই ফাঁকে হুতিদেরও সাজা দিতে। কিন্তু ট্রাম্প হুতিদের সঙ্গে পৃথক শান্তিচুক্তি করে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পতাবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপদ করেছেন। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বিদেশি শক্তিগুলোর সক্রিয় সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য জরুরি। বিকল্প হিসেবে মোহাম্মদ বিন সালমান তুর্কিয়ে ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা জোট করেছেন, সম্প্রতি সে চুক্তির আওতায় যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করেছেন। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিকে ইরান সার্থকভাবে তার প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার করায় হুতিরা উৎসাহিত হয়েছে একই কায়দায় লোহিতসাগরে তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করতে। বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে তারা সৌদি তেলবাহী জাহাজের চলাচল চ্যালেঞ্জ করছে। সৌদি আরব আগেই এমনতর অনুমান করেছিল। এ বছরের জুলাইয়ে সৌদি আরব ৫১টি দেশ নিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল নিরাপত্তা বৈঠকের আয়োজন করে। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ সেখানে যৌথ প্রতিরক্ষামূলক সামুদ্রিক জোট গঠন করে। কিন্তু বহুবিধ ফ্রন্ট একসঙ্গে উন্মুক্ত করে মোহাম্মদ বিন সালমানের সৌদি আরব এখন নিজেই গভীর সংকটে পতিত। কনসার্টের মতো বহু বৈশ্বিক মেগা ইভেন্ট স্থগিত করতে হয়েছে। বহুল আলোচিত বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত করতে হয়েছে। আরব আমিরাত ক্রমেই ভিন্নপথে হাঁটতে শুরু করেছে। যৌথ নিরাপত্তা প্রস্তাবে মিসর শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়নি। ইরান যুদ্ধে স্পষ্ট পক্ষ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেনে যে সরকারকে সৌদি আরব এতকাল সমর্থন জুগিয়ে আসছে, তা নিজে অকার্যকর হওয়ায় সৌদি আরবকে কোনো সুবিধা দিতে পারছে না। বরং হুতিরা সামরিকভাবে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এমনকি কৌশলগত সুবিধা পাওয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠছে।
সৌদি আরবের সামনে তাহলে এখন করণীয় কী? সৌদি-হুতি দ্বন্দ্ব কি সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের প্রকাশ্য রূপ? সামরিক সমাধান ছাড়া কি এর আর কোনো সমাধান নেই?
নিশ্চয়ই আছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবকিছুকে জটিল করে ফেলেছে। তারপরও মনে হয় আঞ্চলিক কূটনীতি, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ এবং প্যালেস্টাইনের পূর্ণ স্বাধীনতা মধ্যপ্রাচ্যে আপাত শান্তি এনে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য অস্থিতিশীলতা মানেই অকল্যাণ। মোহাম্মদ বিন সালমান যত দ্রুত স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেবেন, তত দ্রুত আশা করা যায় সৌদি-হুতি সংঘাত বন্ধ হতে পারে।
লেখক: সাবেক কূটনীতিক




