ক্ষোভ একসময় রাজপথে দৃশ্যমান হয়

সংগৃহীত ছবি
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার শক্তিতে। আর সেই শক্তির মূল ভিত্তি আস্থা। প্রশ্নপত্র, ফলাফল কিংবা পরীক্ষার সূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস— রাষ্ট্র তাদের কথা শুনছে, তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়েই নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা সেই বিশ্বাসের ভিত কতটা নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে, তার একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
সংকটের পর সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে কয়েকটি নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে। দুর্যোগ বা অনিবার্য পরিস্থিতিতে বিকল্প সুযোগ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে নীতির শক্তি শুধু প্রজ্ঞাপনে নয়; মানুষের গ্রহণযোগ্যতায় পরিমাপ হয়। শিক্ষার্থীরা যখন মনে করে, সিদ্ধান্ত তাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে, তখন ভালো উদ্যোগও সন্দেহের মুখে পড়ে। তাই নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি আস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের আরও একটি শিক্ষা দিয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের ভাষা শুধু ব্যক্তিগত মত নয়; সেটি প্রতিষ্ঠানের চরিত্রও বহন করে। একটি অসতর্ক মন্তব্য মুহূর্তেই হাজারো শিক্ষার্থীর মনে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। পরে ব্যাখ্যা বা দুঃখ প্রকাশ পরিস্থিতিকে কিছুটা স্বাভাবিক করলেও প্রথম আঘাতের স্মৃতি সহজে মুছে যায় না। সম্মানবোধ ক্ষুণ্ন হলে সংলাপের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও গণতান্ত্রিক সমাজের একটি বাস্তব প্রকাশ। তরুণদের কণ্ঠকে অবজ্ঞা করলে ক্ষোভ জমে। আর সেই ক্ষোভ একসময় রাজপথে দৃশ্যমান হয়। তবে আন্দোলনের শক্তি তার উচ্চ স্বরে নয়, নৈতিক অবস্থানে। এমন প্রতিবাদই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, যা জনদুর্ভোগ না বাড়িয়ে সমাজকে ভাবতে বাধ্য করে এবং সমাধানের পথ খুলে দেয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন নীতিমালা প্রণয়ন নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস পুনর্গঠন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং ভুল স্বীকার করার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া সেই বিশ্বাস ফিরবে না। শিক্ষা শুধু পরীক্ষা আয়োজনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে নতুন উদ্যোগ অবশ্যই দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থীদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তাদের স্বপ্নকে রাষ্ট্র নিজের বলেই মনে করে।
লেখক: কবি, ফেনী




