নারী কবে নিজের ‘অভিভাবক’ হতে পারবে

‘আহারে মন’ মুভিটি ২০১৮ সালের। সেখানে একজন নারী একা বিদেশে যাচ্ছেন। হাতে বৈধ পাসপোর্ট, টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব আছে, তবু ইমিগ্রেশন কাউন্টারে তাকে একগাদা প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে— কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, বিয়ে না করে একা ইতালি যাচ্ছেন কেন? অভিভাবক সঙ্গে নেই কেন? ওই নারী সর্বশক্তি দিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সঙ্গে তর্ক করলেন। বললেন, কোনো মেয়েকে পরাধীন রাখার জন্য আপনাদের মতো দু-একজন মানুষই যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত তাকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। পাসপোর্টে সিল দিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা হেসে বললেন, ‘এইভাবে ভয়েস রেইজ করলে আমার মতো যেসব মানুষের কানে জং ধরেছে, সেই জং ঝরে পড়বে আস্তে আস্তে।’
সম্প্রতি নেপালে যাওয়ার সময় তিন অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ইমিগ্রেশন থেকে আটকে দেওয়ার পর ওই তিন নারীও বিষয়টি মেনে নেননি; ভয়েজ রেইজ করেছেন। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তারা বিবাহিত কি না, তাদের পরিবার এই সফরের বিষয়ে জানে কি না এবং কোনো অভিভাবক ছাড়া তারা কেন বিদেশে ভ্রমণ করছেন? আপত্তিকর এই সওয়াল-জবাব শেষে তাদের নেপালযাত্রা আটকে দেয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ।
ওই তিন নারী এরপর সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং দেশ জুড়ে একটা হইচই ফেলে দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কোনো আইনগত কারণ না দেখিয়ে তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হয়েছে। এরকম অপ্রীতিকর ঘটনা অতীতে একাধিকবার বিভিন্নভাবে ঘটেছে আমাদের বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ডেস্কে। কিন্তু এ নিয়ে কেউ অভিযোগ দায়ের করেননি। অন্যভাবে বলা যায়, ভয়েজ রেইজ করেননি।
তিন নারীর দায়ের করা রিট পিটিশনকে কেন্দ্র করে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা এবং ঠিক কোন অবস্থায় আইনগতভাবে কাউকে বিদেশে যাওয়া থেকে আটকানো যায়— এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৈধ নথিপত্র থাকার পরও তাদের বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া কেন আইনবহির্ভূত কাজ বলে ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করা কিংবা অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনার ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশ ভ্রমণে যেন বিধিনিষেধ আরোপ না করা হয়, সে বিষয়ে নির্দেশ প্রদান করা কেন হবে না— তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
নারীর প্রতি সম্প্রতি সমাজে যে বিদ্বেষ বাড়ছে, বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের একটি অংশও সেই বিদ্বেষ নীতিতে চলছে
দেশের সংবিধানে নাগরিকদের চলাফেরার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে এতে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। তা ছাড়া আইনের নির্দেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অতএব, কেবল ‘নারী’ বা ‘অবিবাহিত’ হওয়ার কারণে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি বাংলাদেশে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত মূল আইনেও পাসপোর্ট প্রদান বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ‘অবিবাহিত’ হওয়ার বিষয়ে কোনো শর্ত নেই। তবে হ্যাঁ, পাসপোর্ট দেওয়ার সময় শিশু ও অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই বিশেষ খোঁজখবর নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের রুট হিসেবে নেপালকে ব্যবহার করা হচ্ছে— এমন সতর্কতা বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া হয়েছে। নেপালে অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ থাকায় বিমানবন্দরে কাগজপত্র পরীক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
এটাও একটা খোঁড়া যুক্তি। প্রতি মাসে কত নারী যে বিভিন্ন পথে ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সৌদিসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছেন, সেটা তো পত্রিকার পাতা খুললেই টের পাওয়া যায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে তিন লাখের বেশি নারী ও শিশু পাচার হয়েছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি ও অন্যান্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০ হাজার নারী ও শিশু সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন রুট দিয়ে পাচার হয়ে থাকে, যার একটি বড় অংশ এই ২০২৩-২০২৫ সময়কালেও ঘটেছে। এসবের কোনোটাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ইমিগ্রেশন ঠেকাতে পারেনি।
অনেকেই বলছেন, নারীর প্রতি সম্প্রতি সমাজে যে বিদ্বেষ বাড়ছে, বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের একটি অংশও সেই বিদ্বেষ নীতিতে চলছে। পরিবারে, পথেঘাটে, গণপরিবহনে, কর্মক্ষেত্রে, বাজারে, বেড়াতে গিয়ে, হোটেল-রেস্টুরেন্ট সবখানে নারী মৌখিক-শারীরিক দুভাবেই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। রাস্তার অনেক পুরুষ মজা নেন নারীদের দুরবস্থা দেখে। ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা চেয়ারে বসে সেই মজাটাই নিচ্ছেন বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। নারী স্বাধীন-স্বনির্ভর, ক্ষমতাশালী, নিজের টাকায় চলছে— এটা মেনে নেওয়াই কঠিন তাদের পক্ষে। নারীর স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করার প্রবণতা এবং নারী সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা থেকে এ ধরনের আচরণ হতে পারে।
ইমিগ্রেশন পুলিশের এ আচরণ অগ্রহণযোগ্য। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী আরিফ খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘তারা এটি করতে পারেন না। বিদেশে ভ্রমণকারী কোনো নাগরিকের জন্য একটি বৈধ পাসপোর্ট, ভ্রমণের টিকিট এবং ভ্রমণের একটি বৈধ উদ্দেশ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনও ভ্রমণের একটি বৈধ উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আইন ও চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।’ ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়ার কারণে তিন নারীর টিকিট, বুকিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতি হয়। এর দায়ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
বিষয়টি যেহেতু আদালত আমলে নিয়েছেন, আমরা আশা করতে পারি, এর একটা ন্যায়সংগত সুরাহা আমরা দেখতে পাব। তবে আইনি সত্য আদালত নির্ধারণ করলেও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে নারীবিদ্বেষের এই কালচার থেকে বের হতে হবে। নইলে বিভিন্ন পরিসরে বারবার এ প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসতে থাকবে— একজন নারী আসলে কত বছর বয়সে নিজের ‘অভিভাবক’ হতে পারেন?
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক



