ওয়াশিংটনের বাঘ যখন জেনেভায় বিড়াল

ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেইন্সে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রসারের লক্ষ্যে জি৭ নেতা ও সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ইতিহাসের পাতাগুলো বড় চঞ্চল, বিশেষ করে যখন তা ওয়াশিংটনের সাদা প্রাসাদের দোয়াত থেকে ঝরে পড়া কালিতে লেখা হয়। গত বসন্তে, অর্থাৎ ঠিক ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন রণডঙ্কা বেজে উঠেছিল, তখন আকাশ কাঁপিয়ে ঘোষণা এসেছিল—তেহরানের রাজমুকুট ধুলোয় মেশানো হবে। লক্ষ্য ছিল পাঁচটি- সরকার বদলাবে, পরমাণুর চুল্লি ছাই হবে, ক্ষেপণাস্ত্রের ডানা ছাঁটা হবে, পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবহর ডুববে, আর মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ-সুতোগুলো এক টানে ছিঁড়ে ফেলা হবে। শর্ত ছিল একটাই—নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
কিন্তু জেনেভার ফুরফুরে বাতাসে যখন শুক্রবারের সমঝোতা স্মারকের খসড়া উড়ছে, তখন বোঝা গেল, ইতিহাসের চাকা মাঝে মাঝে ১৮০ ডিগ্রি নয়, ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আগের জায়গাতেই ফিরে আসে। একেই হয়তো আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘কৌশলগত পশ্চাদপসরণ’, আর খাঁটি বাংলায়—‘পিঠ বাঁচায়ে পিঠটান’।
শর্তের গোলকধাঁধা ও বিজয়ের নতুন সংজ্ঞা
১৪ দফার এই মহাকাব্যের প্রতিটি ছত্রে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত ট্র্যাজিক-কমেডি। যে মার্কিন নৌবাহিনী পারস্য উপসাগর চষে বেড়াত, তারা এখন চুক্তি সইয়ের ত্রিশ দিনের মধ্যে পোঁটলা-পুটলি বেঁধে ‘যুদ্ধপূর্ব’ অবস্থানে ফিরে যাওয়ার জন্য কাউন্টডাউন শুরু করবে। আর ইসরায়েল যদি নতুন কোনো ‘পাকনামি’ করতে চায়, তবে ট্রাম্প সাহেবকে নিজে গিয়েই তা ঠেকাতে হবে—এ যেন এক অদ্ভুত নাট্যদৃশ্য, যেখানে শিকারি নিজেই এখন পাহারাদার!
সবচেয়ে মনোরম দৃশ্যটি ফুটে উঠছে হরমুজ প্রণালিতে। মার্কিন রণতরীগুলো এতকাল যে প্রণালিকে নিজেদের ব্যক্তিগত লেক মনে করত, সেখানে এখন ইরান দরাজ দিল দেখাবে। তারা মাইন পরিষ্কার করবে, কারিগরি বাধা কাটাবে এবং করুণা করে বিশ্বের জন্য পথ খুলে দেবে। আর এই ‘খুলে দেওয়া’ পথটি দেখেই ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাংকগুলো আনন্দে উদ্বেলিত। গত পরশু যখন স্বয়ং ট্রাম্প মুখ খুললেন, তখন চশমার কাচটি একটু মুছতেই হলো। তিনি চমৎকার এক সাহিত্যিক ডিগবাজি খেয়ে বললেন: ‘আরে ভাই, সরকার পরিবর্তন? ওটা তো আমাদের লক্ষ্যই ছিল না! আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি যেন খোলা থাকে। দেখুন, আমরা সফল!’
কুন্ডেরার বিস্মৃতি ও জিজেকের লাল কালি
বাহ! লক্ষ্য যদি এমনই হবে, তবে ২৮শে ফেব্রুয়ারির সেই হুঙ্কার কি কেবলই বসন্তের কোকিলের ডাক ছিল? ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ (থুড়ি, পুনর্গঠন তহবিল) দিয়ে, জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে যে ‘বিজয়’ উদযাপিত হচ্ছে—তা দেখে মিলান কুন্ডেরা বেঁচে থাকলে হয়তো মুচকি হাসতেন। কুন্ডেরার উপন্যাসের সেই ট্র্যাজিক নায়কদের মতোই ওয়াশিংটন এখন এক চরম ‘অস্তিত্ববাদী বিস্মৃতি’র আশ্রয় নিয়েছে। তারা এত নিখুঁতভাবে নিজেদের আগের ঘোষণাগুলো ভুলে যাচ্ছে যে, এখন নিজেদের তৈরি করা নতুন ইতিহাসকেই তারা একমাত্র সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। এটা কোনো বিজয় নয়, এটা হলো কুন্ডেরীয় ধারার এক 'লঘুতার উৎসব', যেখানে যুদ্ধের সমস্ত ভয়াবহতা ও প্রতিশ্রুতির ওজন এক নিমেষে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে— ‘আমরা তো খেলায় জিততেই এসেছিলাম, এবং ওই যে রেফারি বাঁশি বাজিয়েছে, তার মানে আমরা জিতে গেছি!’
এই পুরো পরিস্থিতিটা বোঝতে স্লাভোয় জিজেকের সেই বিখ্যাত সোভিয়েত জোকসটার কথা মনে পড়ে যায়। এক পোলিশ ভদ্রলোক সাইবেরিয়ায় যাচ্ছেন। তিনি বন্ধুদের বললেন, ‘আমি যখন ওখানে পৌঁছাব, তখন যদি চিঠি নীল কালিতে লিখি, বুঝবে সব সত্যি। আর যদি লাল কালিতে লিখি, বুঝবে সব মিথ্যা।’
এক মাস পর বন্ধুদের কাছে নীল কালিতে লেখা একটি চিঠি এলো। সেখানে লেখা: ‘এখানে সবকিছু চমৎকার। দোকানগুলো খাবারে ঠাসা। সিনেমা হলগুলোতে দারুণ সব পশ্চিমা ছবি দেখানো হচ্ছে। থাকার ঘরগুলো রাজপ্রাসাদের মতো। এখানে কেবল একটা জিনিসেরই অভাব—লাল কালি কিনতে পাওয়া যায় না।’
ওয়াশিংটনের এই ‘বিজয় উদযাপন’ ঠিক সেই নীল কালির চিঠির মতো। তারা ঘরে ফিরে এসে উৎসবের নীল কালিতে লিখছে: ‘আমরা হরমুজ প্রণালি মুক্ত করেছি! আমরা পরমাণু অস্ত্র ঠেকিয়েছি! আমাদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে!’ সব ঠিক আছে, কেবল হোয়াইট হাউসের ড্রয়ারে সেই ‘লাল কালি’টাই আর অবশিষ্ট নেই, যা দিয়ে তারা লিখবে—৩০০ বিলিয়ন ডলার খোয়া গেছে, নিষেধাজ্ঞা কর্পূরের মতো উড়ে গেছে এবং তেহরানের সেন্ট্রিফিউজগুলো আগের মতোই সগর্বে ঘুরে চলেছে!
যখন বাঘ বিড়াল সাজে
আমাদের প্রজন্ম সত্যিই ভাগ্যবান। আমরা এমন এক দৃশ্য দেখছি যেখানে পরাশক্তি তার নিজের লক্ষ্যের সীমানাগুলো রবার দিয়ে মুছে, তেহরানের দেওয়া সীমানাকেই নিজের ‘বিজয় প্রাচীর’ বলে ঘোষণা করছে।
জেনেভায় যখন শুক্রবার কলমের কালি শুকোবে, তখন ওয়াশিংটনের প্রবীণ কূটনীতিকরা হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলবেন, ‘যাক, ইরান তো নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেনি, কিন্তু আমরা যে শর্ত মেনে আত্মসমর্পণ করেছি—তা অন্তত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিলমোহর দিয়ে আইনি রূপ দেওয়া গেল!’
ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায়ের মানানসই বর্ণনা হতে পারে: ‘কী করিয়া ৩০০ বিলিয়ন ডলার খোয়াইয়া, হরমুজ প্রণালির চাবি ফেরত পাইয়া, বিশ্বজয়ের হাসি হাসিতে হয়!’
লেখক: কবি, সাংবাদিক




