নারীর গায়ে হাত তোলায় যেন আর বাধা নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাছের সঙ্গে বাঁধা মেয়েটা আকুল হয়ে কাঁদছে। তাকে যার যেভাবে ইচ্ছা পেটাচ্ছে, চুল কেটে দিচ্ছে, গলায় জুতার মালা পরাচ্ছে। আর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে তার আট আর বারো বছরের ভাইবোন। শরীয়তপুরের সখিপুরের এই মেয়েটির ‘অপরাধ’ ছিল— একজন দোকানির কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। তারপর দোকানে রসদ নিতে গেলে তাকে চোর বানিয়ে দেওয়া হয়, আর সেই বানানো অপরাধের শাস্তি হিসেবে তার শরীরটাকেই বানানো হয় জনপরিসরের শিক্ষামঞ্চ। বহু বছর ধরে সাংবাদিকতা করি, নির্যাতনের খবর লেখা আমার পেশারই অংশ। কিন্তু এই ভিডিওটা আমাকে অন্যরকম একটা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল যেন!
একই সপ্তাহে আরও দুটো ভিডিও চোখের সামনে ঘুরছিল। রাজধানীর বিজয় সরণিতে পুলিশ সদস্যরা মারধর করছেন এক পথচারী নারীকে; সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরায় এক সাংবাদিককে তুলে নিয়ে ভ্যানের ভেতরেই নির্যাতন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে স্কুলড্রেস পরা এক কিশোরীকে পেছন থেকে কোনো কারণ ছাড়াই লাথি মারে এক কিশোর। ভিডিও ভাইরাল হয়, ছেলেটি কোনো শাস্তি পায় না, উল্টো স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র ধরিয়ে বের করে দেয় মেয়েটিকেই।
সবসময় দেখে এসেছি, সমাজ ও রাষ্ট্র এক অলিখিত নিয়ম মেনে চলে— নারীর গায়ে হাত তোলা যাবে না। এই বোধটা সবার মধ্যে গেঁথে আছে বলেই মানতাম। কিন্তু এখন মনে হয়, সেই বিশ্বাসটা যেন মুছে যাচ্ছে।
যে তিনটি ঘটনার কথা বললাম, সেগুলো আলাদা প্রেক্ষাপটের— একটি গ্রামীণ সালিশি সহিংসতা, একটি রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, একটি কিশোর-কিশোরীর সহিংসতা। কিন্তু এক জায়গায় এসে সব মিলে যায়— নারীর শরীরকে জনসমক্ষে, দর্শকের সামনে, শাস্তি বা নিয়ন্ত্রণের বার্তাবাহী করে তোলা; আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া।
মিশেল ফুকো তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে জনসমক্ষে শরীরকে শাস্তির বিষয়বস্তু করে তোলার সামন্ততন্ত্রীয় প্রদর্শন ছেড়ে অদৃশ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার দিকে সরে গিয়েছিল। প্যানপ্টিকনের যুগে ক্ষমতা কাজ করত নজরদারির মাধ্যমে, প্রকাশ্য নিপীড়নের মাধ্যমে নয়। কিন্তু গাছে বেঁধে, চুল কেটে, জুতার মালা পরানোর এই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, আমরা যেন ইতিহাসের উল্টো স্রোতে হাঁটছি। প্রাক-আধুনিক জনসমক্ষে শাস্তি ফিরে এসেছে, তবে একটা নতুন উপাদান নিয়ে— মোবাইল ক্যামেরা। ফুকোর যুগে প্রদর্শন ছিল একবারের, সাময়িক। আজ প্রতিটি সহিংসতা রেকর্ড হয়ে চিরস্থায়ী ডিজিটাল আর্কাইভে ঢুকে যায়, বারবার দেখা হয়, শেয়ার হয়; ‘ভাইরাল’ শব্দের নিচে এক ধরনের নতুন অর্থনীতি খাড়া করে। গি ড্যুবোয়া যেটিকে ‘প্রদর্শনীর সমাজ’ বলেছিলেন, যে সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের আর সরাসরি যোগাযোগ ঘটে না; ঘটে ইমেজ বা চিত্রের মধ্য দিয়ে। সহপাঠিনীকে লাথি মারা কিশোরটির কাছে বা তরুণীকে গাছে বেঁধে পেটানোর ভিডিও ধারণ করা যুবকের কাছে সহিংসতা আর নিছক সহিংসতা থাকে না, সেটি হয়ে যায় দর্শকসংখ্যার বিনিময়যোগ্য মুদ্রা।
গাছে বেঁধে, চুল কেটে, জুতার মালা পরানোর এই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, আমরা যেন ইতিহাসের উল্টো স্রোতে হাঁটছি। প্রাক-আধুনিক জনসমক্ষে শাস্তি ফিরে এসেছে, তবে একটা নতুন উপাদান নিয়ে— মোবাইল ক্যামেরা
আর ডব্লিউ কনেলের ‘হেজিমনিক ম্যাসকুলিনিটি’ বা ‘আধিপত্যশীল পুরুষত্ব’-এর ধারণাটা আমাদের পুরো বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করতে পারে। কনেল দেখান, পুরুষত্ব কোনো স্থির ধারণা নয়; বরং বারবার সম্পাদনার মাধ্যমে পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে হয়, বিশেষত যখন চেনা ক্ষমতা-কাঠামো টলে যায়। রাজনৈতিক উত্তরণকালে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব যখন প্রশ্নবিদ্ধ, পুলিশের বৈধতা টলমল, সামাজিক শৃঙ্খলা অনিশ্চিত— তখন প্রান্তিক পুরুষত্ব নিজেকে জাহির করার সবচেয়ে সহজলভ্য জায়গাটাই খুঁজে নেয়, আর সেটি নারীর শরীর। রাস্তায় ক্ষমতা জাহির করতে না পারার হতাশা থেকে পুলিশ সদস্য যখন এক পথচারী নারীর ওপর চড়াও হন বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রশমিত করতে না পেরে উগ্রপন্থিরা নারী আন্দোলনকারীকে লক্ষ্যবস্তু বানায়— দুটোই একই মনস্তত্ত্বের প্রকাশ। বেল হুকস ‘দ্য উইল টু চেঞ্জ’-এ লিখেছিলেন, পিতৃতন্ত্র একবারে থিতু হয়ে যাওয়া ব্যবস্থা নয়, তাকে টিকে থাকতে হলে বারবার সহিংসতার মধ্য দিয়ে নিজেকে নবায়ন করতে হয়।
সোনারগাঁয়ের ঘটনাটা আমাকে অন্যভাবে পীড়া দেয়, কারণ এখানে সহিংসতার চেয়েও ভয়ংকর যা, তা হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া। স্কুল এমন একটা জায়গা, যেখানে পরিবারের বাইরে প্রথম কোনো শিশু বা কিশোর শেখে সীমা কাকে বলে, শৃঙ্খলা কাকে বলে, ন্যায়বিচার কাকে বলে; আর সেই শিক্ষারই একেবারে গোড়ার কথা হওয়া উচিত ছিল, নারীর বা শিশুর গায়ে হাত তোলা যায় না। কিন্তু সোনারগাঁয়ে যে ছেলেটা লাথি মারল, তার কোনো শাস্তি হলো না; অথচ মেয়েটিকে বহিষ্কার করা হলো— যেন তার অপরাধ লাথি খাওয়া নয়, তার অপরাধ ভিডিওতে দৃশ্যমান হয়ে পড়া, প্রতিষ্ঠানের ‘সম্মান’-এ দাগ ফেলা। এখানে প্রতিষ্ঠান নিজেই সেই নীরব কোডটা ভাঙল দুইবার; প্রথমবার নীরব থেকে সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিয়ে, দ্বিতীয়বার ভুক্তভোগীকে অপরাধী বানিয়ে। যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল কোডটা রক্ষা করা এবং শেখানো, সে নিজেই তা সবচেয়ে নির্লজ্জভাবে ভেঙে দিল, আর শিখিয়ে দিল একটা উল্টো পাঠ— সহিংসতা নয়, সহিংসতার দৃশ্যমানতাই আসল অপরাধ।
শরীয়তপুরের ঘটনাটায় আরেকটি স্তর উন্মোচিত হয়। কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের শাস্তি হিসেবে আনা হলো ‘চুরি’র অভিযোগ। যৌন প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়াকে আড়াল করতে একটা নৈতিক অপরাধের গল্প তৈরি করা হলো, যা জনতাকে ‘বিচারক’ সাজার বৈধতা দিল। একটা অভিযোগ যখন সামাজিক উৎকণ্ঠার (এখানে চুরি, ‘নষ্ট মেয়ে’র ভয়) সঙ্গে জুড়ে যায়, তখন সেটি দ্রুত সামষ্টিক সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আর লক্ষ করার মতো বিষয়— বিচারের নামে যে সহিংসতা ঘটল, তার প্রতিটি উপাদান, চুল কাটা থেকে জুতার মালা পর্যন্ত, ঐতিহাসিকভাবেই নারীর ‘সম্মান’ ভাঙার প্রতীকী ভাষা।
তাহলে আমার সেই বিশ্বাস, যে নারীর গায়ে হাত তোলা যায় না, সেই নীরব চুক্তিটার কী হলো? এটি সমাজের হঠাৎ ‘প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠা’ নয়; বরং একটা অস্থায়ী মুখোশ সরে গিয়ে কাঠামোগত পিতৃতন্ত্রের চেনা মুখটা আবার বেরিয়ে আসা।
তবে ‘সমাজ আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে’— এই সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও হয়তো ভুল হবে। যা সত্যিই বদলেছে, তা মূলত দৃশ্যমানতা। আগে এই সহিংসতাগুলো ঘটত নীরবে; গ্রামীণ সালিশের চার দেয়ালে, থানার ভেতরের করিডরে, স্কুলের বন্ধ ঘরে— রেকর্ড ছাড়াই হারিয়ে যেত। আজ প্রতিটি ফোনে ক্যামেরা থাকায় সেই একই পিতৃতান্ত্রিক সহিংসতা আর অদৃশ্য থাকতে পারছে না। কিন্তু ঠিক সেই দৃশ্যমানতাই আবার তাকে মুনাফা আর ক্ষমতার নতুন ভাষায় রূপান্তর করে দিচ্ছে। এই নতুন দৃশ্যমানতাকে আমরা জবাবদিহির দিকে নিয়ে যাব, নাকি বারবার তামাশার মঞ্চে পরিণত হতে দেব?
লেখক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস




