রান্নাঘরে রাঁধুনি একজন থাকাই ভালো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আহা রান্নাঘর! পরম পবিত্র স্থান। যেখানে সরষে ইলিশের সুবাস ছড়ায়। পোলাওয়ের চাল দমে বসে। কিন্তু সেই রান্নাঘরে যদি রাজনীতির খিচুড়ি পাকতে শুরু করে? তাও আবার রাষ্ট্র চালানোর খিচুড়ি? তবে বুঝতে হবে, ডাল আর চালের অনুপাত কোথাও একটা গোলমাল হয়ে গেছে।
আজকাল বাজারে একটা নতুন শব্দ ভাসছে। ‘কিচেন কেবিনেট’। বাছা বাছা বাবুর্চিদের গোপন আস্তানা। যেখানে ডাল-ভাতের চেয়ে বেশি ফোড়ন পড়ে দেশের ভাগ্যে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন কেবিনেটের আলাপই দিচ্ছি। সাতজনের এক অতি গোপন হেঁশেল। প্রতি মঙ্গলবার সেখানে নাকি সুস্বাদু সব সিদ্ধান্ত রান্না হতো। বাকি উপদেষ্টারা বাইরে ডাইনিং টেবিলে বসে শুধু গন্ধ শুঁকতেন। প্লেট হাতে চেয়ে থাকতেন। কিন্তু আসল পদটি তাদের পাতে পড়ত না।
রান্নাঘর ছাড়া কি আর কোনো জমানায় সংসার চলেছে? রাজা-বাদশাদের আমল থেকেই আসল খেলাটা শোবার ঘর আর রান্নাঘরেই হতো। দরবার কক্ষ তো কেবলই সই-সাবুদ করার একটা পোশাকি মঞ্চ।
দিল্লি দূরস্ত। সেই ইন্দিরা গান্ধীর আমলেও কাশ্মীরি বাবুর্চিরা মনমোহন মসলা পিষতেন। ইন্দিরাজি যা শুনতেন, হেঁশেল থেকেই শুনতেন। ডাউনিং স্ট্রিটে মার্গারেট থ্যাচার তো মন্ত্রীদের ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে সোজা রান্নাঘরে চলে যেতেন। সেখানে চার্লস আর বার্নার্ডের সঙ্গে চলত কড়া কফির আড্ডা। আয়রন লেডি লোহার কড়াইয়ে কী রাঁধছেন, তা বাকি কেবিনেট টের পেত বিল পাস হওয়ার পর। মার্কিন মুলুকে অ্যান্ড্রু জ্যাকসন তো হোয়াইট হাউসের আসল রান্নাঘরে বসেই পুরো দেশের ভূগোল বদলে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই এই ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দের উৎপত্তি। সুতরাং, ইউনূস সাহেব নতুন কোনো রেসিপি আবিষ্কার করেননি। তিনি শুধু পুরনো কড়াইয়ে নতুন তেল ঢেলেছেন।
আমাদের নিজেদের ঘরের দাওয়ার খোঁজ নেওয়া যাক। বিগত ১৫ বছর এই বঙ্গে কি কম ঘি-চর্বির রান্না হয়েছে? শেখ হাসিনার আমলের সেই রাজকীয় রন্ধনশিল্পীদের কথা কি এত দ্রুত ভুলে গেলেন দেশবাসী? তারা এমন ক্ষীর তৈরি করতেন যে, পুরো দেশটাই এক গ্রাসে গিলে ফেলা যেত। বাকি মন্ত্রীরা তখন কেবল ডাইনিং টেবিলের ক্লথ পরিষ্কার করতেন। আর চামচ চকমক করছে কি না, তা দেখতেন। ওটাই ছিল একচেটিয়া মোগলাই রান্না।
তবে তফাৎ একটা আছে। আগের বাবুর্চিরা বুক ফুলিয়ে রাঁধতেন। লোকে জানত, অমুক ভাই বা তমুক আপা নাড়ু পাকাচ্ছেন। কার উনুনে কতটা আঁচ, তা বাইরে থেকে স্পষ্ট বোঝা যেত। কিন্তু অন্তর্বর্তী হেঁশেলটা একটু বেশিই ঘোলাটে ছিল। কারণ, এই বাবুর্চিরা এসেছিলেন এক বিরাট অভ্যুত্থানের পর। তারা এসে বলেছিলেন, তারা নাকি তেল-মসলা ছাড়া একদম অর্গানিক ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াবেন জাতিকে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, কোথায় কী অর্গানিক খাবার! নিজেদের জন্য অর্গানিক আর দেশের জন্য গোলমরিচের ঝাল লুকিয়ে ছিল। একই ফর্মুলা। খোদ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ সাহেব নাকি জানতেনই না, তার রান্নাঘরে কবে মার্কিন সস দিয়ে মস্ত বড় চুক্তি তৈরি হয়ে গেছে! তিনি যখন নিজের দপ্তরে বসে ডাল সাঁতরাচ্ছেন, তখন অন্য কেউ পেছনের দরজা দিয়ে এসে ডেজার্ট সার্ভ করে দিয়েছে। তাও আবার জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে! সেই মিষ্টির স্বাদ কেমন ছিল, তা এখন বর্তমান নির্বাচিত সরকার হাতড়ে বেড়াচ্ছে। তৌহিদ সাহেব এখন আফসোস করে বলছেন, তিনি নাকি তিন তিনবার অ্যাপ্রোন খুলে পদত্যাগের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকে গেলেন কি সুস্বাদু পদের মোহে?
গণতন্ত্রে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। আপনি রেস্তোরাঁয় কী রাঁধছেন, তা অন্তত মেনু কার্ডে লেখা থাকতে হবে। বিল দেওয়ার সময় যেন গ্রাহক, অর্থাৎ জনগণ চমকে না যান। কিন্তু অন্তর্বর্তী হেঁশেলের বাবুর্চিরা ভাবলেন অন্য কথা। তারা ভাবলেন, আমরা তো জনগণের ভোটে রেস্তোরাঁর লাইসেন্স পাইনি। আমরা এসেছি এক ঝোড়ো রাতে, জানলা গলে। সুতরাং, আমাদের আবার রেসিপি দেখানোর দায় কিসের? আমরা স্যুপ বানাব, আপনারা চোখ বন্ধ করে চামচ নাড়িয়ে খাবেন। টক হলেও গিলবেন, মিষ্টি হলেও গিলবেন।
একটি অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ আর পাঁচটা রাজনৈতিক সরকারের মতো নয়। তাদের কাজ হলো ভাঙা উনুনটা মেরামত করে নতুন বাবুর্চির হাতে তুলে দেওয়া। নিজেরা বসে ভূরিভোজ করা নয়। কিন্তু যখন দেখা যায়, মেরামত বাদ দিয়ে তারা নিজেরাই নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করছেন, তখনই জনতার পেট গুড়গুড় করতে শুরু করে।
এখন অবশ্য সেই অন্তর্বর্তী হেঁশেল ভেঙে গেছে। নতুন নির্বাচিত সরকার এসেছে। নতুন রাঁধুনিরা উনুনে আঁচ দিয়েছেন। পুরনো বাবুর্চিরা এখন টেলিভিশনের পর্দায় এসে হাত ধুয়ে বলছেন, ‘ভাই রে, নুনটা কিন্তু আমি কম দিইনি। ওই যে বাকি সাতজন, ওরাই তরকারিতে চিনি বেশি ঢেলেছিল।’ সাখাওয়াত সাহেব বলছেন তিনি জানতেন না, আসিফ সাহেব বলছেন তিনি টেরই পাননি। তাহলে রান্নাটা করল কে? ভূত? নাকি কোনো অদৃশ্য বিদেশি শেফ এসে বাটি চালনা করে দিয়ে গেল?
রাজনীতিতে আসলে আসল কেবিনেট হলো দুধের মতো। তার একটা পুষ্টিগুণ আছে, প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা আছে। আর কিচেন কেবিনেট হলো ঘোলের মতো। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে গিয়ে বাঙালি চিরকালই পেট খারাপ করে মরে। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
সব শেষে একটা বিনীত প্রশ্ন তোলা যাক। পরবর্তী হেঁশেলটা কার? মসলা বাটা কি শুরু হয়ে গেছে? উনুনে আঁচ পড়ল বলে! নতুন রাঁধুনিরা যেন মনে রাখেন, বেশি বাবুর্চিতে কিন্তু চিরকালই ডিজিটাল এবং অ্যানালগ, উভয় প্রকারের ঝোলই নষ্ট হয়। ওলন্দাজদের সেই পুরনো প্রবাদটি মাথায় রাখা ভালো, রান্নাঘরে রাঁধুনি একজনই থাকা ভালো, বাকিরা শুধু থালা ধোয়ার কাজ করুক। তা না হলে, ক্ষমতার লোভের সেই ঝোলে শেষ পর্যন্ত মাছিই পড়বে, জনগণের পেট ভরবে না।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক






