বিশ্ববিদ্যালয় কার: শিক্ষার্থীর, না ‘বড় ভাইদের’?

অনুজীববিজ্ঞানী ইরফান রহমান
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একজন তরুণের প্রথম পরিচয়টি কার সঙ্গে হওয়া উচিত? শিক্ষকের সঙ্গে, না হলের তথাকথিত ‘বড় ভাই’-এর সঙ্গে? তাঁর প্রথম রাতটি কি নতুন বন্ধু, নতুন বই আর নতুন স্বপ্নে কাটবে, না কোনও ‘গেস্টরুমে’ দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা দিতে হবে? তিনি কি নিজের বিবেক অনুযায়ী কথা বলবেন, না আবাসিক আসন হারানোর ভয়ে মুখস্থ করবেন অন্যের দেওয়া স্লোগান?
বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখা হয়েছে ভয়, অপমান এবং রক্ত দিয়ে। ‘গেস্টরুম’ শব্দটি শুনতে নিরীহ। বাস্তবে এটি ছিল অনেক আবাসিক হলে সমান্তরাল ক্ষমতার আদালত। সেখানে নবীন শিক্ষার্থীকে গভীর রাত পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। বৈধ আবাসিক আসনকে অধিকার হিসেবে নয়, রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এগুলো নিছক র্যাগিং ছিল না। ছিল মানুষকে ভেঙে দিয়ে বাধ্য অনুগত কর্মীতে পরিণত করার একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা।
সেই ব্যবস্থার নির্মমতম পরিণতিগুলোর একটি বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। পরদিন ভোরে উদ্ধার হয় তাঁর মরদেহ। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। কিন্তু আপিল বিভাগে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বাকি।
আবরার হত্যার পর সাত বছর পেরিয়েছে। একটি প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হয়ে নতুন প্রজন্ম এসেছে। কিন্তু যে প্রশ্ন আবরারের মৃত্যু আমাদের সামনে রেখেছিল, তার উত্তর কি রাষ্ট্র দিতে পেরেছে? আদালতের দুই স্তরে রায় এসেছে, কিন্তু ভবিষ্যতের আবরারকে রক্ষার নিশ্চয়তা কোথায়? অপরাধের বিচার এবং অপরাধ প্রতিরোধ এক বিষয় নয়। আদালত অতীতের অপরাধের বিচার করেন; রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে একই অপরাধ আর সংঘটিত না হয়।
আবরার প্রথম শিকারও নন। ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবায়ের আহমেদ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) অভ্যন্তরীণ বিরোধে হামলার শিকার হয়ে মারা যান। ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন রাজনীতির বাইরে থাকা আবু বকর সিদ্দিক। ২০১৬ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে শীতের মধ্যে বারান্দায় থাকার পর টাইফয়েড ও নিউমোনিয়ায় মারা যান হাফিজুর মোল্লা। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেও তাঁকে চাপ দেওয়া হতো বলে পরিবারের অভিযোগ।
২০২৩ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থী ফুলপরী খাতুনকে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়; প্রশাসনিক ব্যর্থতাও সামনে আসে। অভিযুক্ত পাঁচ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে এবং জাহাঙ্গীরনগরে জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লাকে মারধর করা হয়। দুজনই প্রাণ হারান। নির্যাতনের প্রতিশোধ কখনও বিচার হতে পারে না।
২০২৪ সালের অক্টোবরে এসআরও নং ৩৬৯-আইন/২০২৪ জারি করে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু সংগঠন নিষিদ্ধ হলেই দখলদারি শেষ হয় না। ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ঘিরে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ তা মনে করিয়ে দেয়। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কিংবা অন্য যে কোনও সংগঠন, অপরাধের ক্ষেত্রে পরিচয় নয়, একই আইন প্রযোজ্য হতে হবে।
প্রয়োজন ‘ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও নিপীড়ন প্রতিরোধ আইন’। ২০২৩ সালের বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ নীতিমালা কার্যকরের বিষয়ে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৫ সালে নীতিমালাটিকে আইনের মর্যাদায় বিবেচনার পাশাপাশি ১৭ দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। প্রতিরোধ কমিটি, অভিযোগ বাক্স, সিসিটিভি ও দ্রুত তদন্তের নির্দেশনা থাকলেও প্রতিষ্ঠান নিজের ব্যর্থতা তদন্ত করলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাজনৈতিক জবরদস্তি ও অভিযোগকারীর সুরক্ষারও কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন। শুধু নীতিমালা থাকলেই হবে না। তার বাস্তবায়ন, নজরদারি এবং লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ভারতের ২০০৯ সালের র্যাগিংবিরোধী বিধিমালায় নজরদারি দল, শ্রীলঙ্কার ১৯৯৮ সালের আইনে র্যাগিং ও বেআইনি আটকের শাস্তি, ফিলিপাইনের ২০১৮ সালের আইনে হেজিং ও সংশ্লিষ্ট নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাম্পাসের অপরাধ ও নিরাপত্তাতথ্য প্রকাশ এবং ইংল্যান্ডের কন্ডিশন ই৬-এ যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগ মোকাবিলার কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশকে নিজস্ব বাস্তবতায় এগুলো থেকে শিখতে হবে।
আইনে গেস্টরুম নির্যাতন, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, সাইবারবুলিং, বেআইনি আটক, চাঁদাবাজি, মব-জাস্টিস, জোরপূর্বক মিছিল-স্লোগান, আসনের বিনিময়ে আনুগত্য, হলছাড়া, একাডেমিক প্রতিশোধ ও বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। উপাচার্যের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ওমবাডসম্যান এবং জাতীয় ক্যাম্পাস নিরাপত্তা কমিশন দরকার। তদন্তের সময়সীমা, সাক্ষী-অভিযোগকারীর সুরক্ষা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষসমর্থন ও আপিলের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের পর উচ্ছেদ, পরীক্ষায় হয়রানি ও হুমকির জন্য পৃথক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিমুক্ত নয়, দখলমুক্ত হওয়া চাই। মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকার থাকবে; হলের আসন বণ্টন করবে প্রশাসন, ছাত্রসংগঠন নয়। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং সংগঠনের অর্থ ও নির্বাচনী ব্যয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তাহীনতা মুক্তচিন্তা ও গবেষণাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যে শিক্ষার্থী মত প্রকাশেই ভয় পান, তিনি গবেষণায় প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করবেন কীভাবে? কিউএস বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং ২০২৭-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে ৬০০তম, বুয়েট ৭১১ থেকে ৭২০-এর মধ্যে। আগের বছরের তুলনায় ঢাকার অবস্থান কিছুটা নেমেছে, বুয়েটের উন্নতি হয়েছে। তবে র্যাঙ্কিংয়ের সঙ্গে ক্যাম্পাস সহিংসতার সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক দাবি করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, স্বাধীন গবেষণা ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন সমানভাবে জরুরি। জাতীয় উচ্চশিক্ষা গবেষণা ও স্বাধীনতা সনদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটের অন্তত পাঁচ শতাংশ গবেষণা, ল্যাব, পিএইচডি ফেলোশিপ ও উদ্ভাবনে ব্যয়ের লক্ষ্য প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সামনে এ সংস্কারকে দলীয় অর্জনের ঊর্ধ্বে তোলার সুযোগ রয়েছে।
আমরা আবরারের জন্য কেঁদেছি। হাফিজুরকে প্রায় ভুলে গিয়েছি। তোফাজ্জলের মৃত্যুর পর আবার ক্ষুব্ধ হয়েছি। প্রতিটি ঘটনার পর মোমবাতি জ্বলেছে, মানববন্ধন হয়েছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারপর সংবাদচক্র বদলেছে; নতুন শিক্ষার্থী এসেছে; পুরনো ভয় অন্য নামে ফিরে এসেছে। এই পুনরাবৃত্তির কারণ শুধু আমাদের স্মৃতির দুর্বলতা নয়; আইনি সুরক্ষার ঘাটতি, প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়হীনতা।
আবরারকে সত্যিকার অর্থে স্মরণ করা হবে তখনই, যখন আর কোনও শিক্ষার্থীকে ফেসবুক পোস্টের জন্য কক্ষে ডেকে নির্যাতন করা যাবে না। হাফিজুরের প্রতি ন্যায়বিচার হবে তখন, যখন একটি আসনের জন্য কাউকে রাজনৈতিক নেতার দরজায় দাঁড়াতে হবে না। ফুলপরীর সাহসের মর্যাদা রক্ষা হবে তখন, যখন অভিযোগ জানাতে কোনও নবীন শিক্ষার্থীকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে হবে না। তোফাজ্জল ও শামীমের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে তখন, যখন কোনও দল বা জনতা নিজেকে আদালত ভাবতে সাহস করবে না।
এই মানুষগুলোর মৃত্যু ও নির্যাতনের স্মৃতি কেবল শোকের আয়োজন হয়ে থাকতে পারে না। স্মরণকে পরিণত করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে। বাংলাদেশ বহুবার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, পরিপত্র জারি করেছে, ঘটনার পরে ক্ষোভও প্রকাশ করেছে। এবার প্রয়োজন এমন স্থায়ী আইনি কাঠামো, যা শিক্ষার্থীকে রক্ষা করবে, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে আনবে, রাজনৈতিক জবরদস্তি বন্ধ করবে, ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে দেবে।
প্রশ্ন হলো, আর কত মৃত্যু হলে আমরা বুঝব, শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা কোনও প্রশাসনিক অনুগ্রহ নয়, শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার? আর কত তদন্ত কমিটি, কত মানববন্ধন, কত শোকবার্তার পর রাষ্ট্র স্বীকার করবে, বিচ্ছিন্ন নির্দেশনা দিয়ে সুসংগঠিত নিপীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ করা যায় না?
গেস্টরুমের অন্ধকার থেকে গবেষণাগারের আলোয় পৌঁছানোর পথ দীর্ঘ। কিন্তু সেই পথের প্রথম পদক্ষেপ আর অনির্দিষ্ট রাখা চলে না। বাংলাদেশের সংসদে অবিলম্বে ‘ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও নিপীড়ন প্রতিরোধ আইন’ উত্থাপন করতে হবে।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর মাথার ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতটি কোনও ‘বড় ভাই’-এর হতে পারে না। সেটি হতে হবে আইনের।
লেখক: অণুজীববিজ্ঞানী। নন-পোর্টফোলিও ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসার, ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, যুক্তরাজ্য



