জাতীয়তাবাদ, জুলাই ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারণা। রাষ্ট্রের জন্ম, তার বৈধতা, জনগণের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং জাতীয় পরিচয়— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘একটি কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়’ হিসেবে, যেখানে সদস্যরা একে অন্যকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও অভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে একই সম্প্রদায়ের অংশ মনে করেন। আর্নেস্ট গেলনার একে যুক্ত করেছেন আধুনিক সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে। আর অ্যান্থনি ডি স্মিথ গুরুত্ব দিয়েছেন ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ওপর। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের বিকাশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। তবে আমাদের পথচলা ছিল আরও রক্তক্ষয়ী ও জটিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর একটি পুরনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে: রাষ্ট্রের পরিচয় কী? আমরা কি শুধু ভাষাভিত্তিক একটি জাতি, নাকি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক/ জাতি? পৃথিবীর ইতিহাস আমাদের শেখায়, শুধু মানচিত্রে জন্ম নিলেই একটি রাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিপক্ব জাতিতে পরিণত হয় না। এক দিনে মানচিত্র আঁকা যায়; কিন্তু জাতীয় পরিচয়, নাগরিক আস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য গড়ে ওঠে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক-সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে।
আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রথম বিকাশ ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মূল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুঘটক, যা একটি জাতিকে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— যুদ্ধবিধ্বস্ত এই রাষ্ট্রের পরিচয়ের ভিত্তি কী হবে? একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব ধর্ম, গোষ্ঠী ও নৃগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয় গড়ে তোলাই হয়ে দাঁড়ায় নবজাত রাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে আজও ভিন্নমত রয়েছে; কেউ একে দেখেন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে, কেউ গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে সামনে আসে; যেখানে ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান ও নাগরিকত্বকে পরিচয়ের কেন্দ্রে আনা হয়।
সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে প্রায়ই পরস্পরবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন চিত্র দেখায়; বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি আর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার নাগরিক ও সার্বভৌম কাঠামো। এ দুই উত্তরাধিকারকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; পরিপূরক হিসেবে দেখাই যুক্তিসংগত।
১৬ জুলাই ২০২৪, রংপুরে আবু সাঈদের আত্মবলিদান তরুণ প্রজন্মের ভেতর অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক জাগরণ ঘটায়। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ৩৫ বছরের নিচে। এই বাস্তবতায় রাজপথের জাগরণ প্রমাণ করে, পুরনো আদর্শিক আলোচনা দিয়ে এই ‘ডিজিটাল’ প্রজন্মের নাগরিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্র সম্পর্কে নাগরিকের প্রত্যাশার পরিবর্তন। একটি বিষয় স্পষ্ট— তরুণ প্রজন্ম শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; চায় জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, ন্যায়বিচার ও সুযোগের সমতা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় গণভোটে এই সনদ ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ে। একদল বিশ্লেষকের মতে, এটি ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক-সাংবিধানিক কাঠামো সংশোধনের ঐতিহাসিক সুযোগ। আবার অন্যরা মনে করেন, তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক আবেগনির্ভর এই সংস্কার-প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষিত কি না, তা নিয়ে আরও সতর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এ বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সারা দেশে পালিত জুলাই শহীদ দিবস প্রমাণ করে, ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন এবং ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন একই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে উঠেছে।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদকে একটি আধুনিক ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দর্শনে রূপ দিতে হলে তা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর
জাতীয় পরিচয়ের পুনর্নির্মাণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৮৭১ সালে অটো ভন বিসমার্ক শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করে জার্মান জাতির আনুগত্য সুদৃঢ় করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাত্রা শুরু করা সিঙ্গাপুরকে লি কুয়ান ইউ গড়ে তুলেছিলেন শূন্য দুর্নীতি ও মেধাভিত্তিক শাসনের ওপর ভর করে। তুরস্কের মুস্তফা কামাল আতাতুর্কও অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর গড়ে তুলেছিলেন নাগরিক অধিকারভিত্তিক আধুনিক প্রজাতন্ত্র। বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার বিবর্তনও এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর নয়; বরং সেই অংশগ্রহণকে সুসংগঠিত রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। আর ম্যাক্স ভেবারের ভাষায়, রাষ্ট্র তখনই দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল হয়, যখন জনগণ তার প্রতিষ্ঠান, আইন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখে। যদি রাষ্ট্র তার চাকমা, সাঁওতাল, বাঙালি, হিন্দু, মুসলিম কিংবা প্রবাসী— প্রত্যেক নাগরিককে সমঅধিকার ও নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে জাতীয়তাবাদ শুধু একটি ফাঁকা রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদকে একটি আধুনিক ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দর্শনে রূপ দিতে হলে তা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর: প্রথমত, ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক বহুত্ববাদ, ধর্ম, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক সমঅধিকার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও গণতান্ত্রিক চেতনা— ১৯৫২, ১৯৭১ ও ২০২৪-এর গণতান্ত্রিক চেতনাকে একত্র করে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় গৌরবগাথা নির্মাণ। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা— ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির বদলে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্র গড়ে তোলা। চতুর্থত, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি ও মানবসম্পদ— প্রবৃদ্ধির সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পঞ্চমত, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি— জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে মর্যাদাশীল বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা।
সমালোচকরা বলতে পারেন, জাতীয়তাবাদ নিয়ে নতুন বিতর্ক ঐক্যের বদলে বিভক্তি তৈরি করতে পারে। এটি যৌক্তিক শঙ্কা। তবে তখনই বিভাজন তৈরি হয়, যখন জাতীয়তাবাদকে দলীয়করণের হাতিয়ার করা হয়; কিন্তু যখন তা সুশাসন, আইনের শাসন ও সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেয়, তখন তা ঐক্যের সেতু তৈরি করে।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি– যার ভিত্তি হতে পারে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চেয়ে আইন গুরুত্বপূর্ণ হবে; অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক উন্নয়নের সুযোগ পাবে এবং জাতীয় ঐক্য, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সবাই অভিন্ন স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়াকে এই সামাজিক চুক্তি পুনর্গঠনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও এর প্রকৃত সফলতা প্রমাণিত হবে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার জনগণের জীবনমান দিয়ে। একটি পতাকা, একটি ভূখণ্ড ও একটি রাজনৈতিক দর্শন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে আশা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে আসে। ইতিহাস বলে, এ দেশের মানুষ বারবার সংকট থেকে নতুন পথ বের করেছে। ১৯৫২ আমাদের ভাষা শিখিয়েছে, ১৯৭১ স্বাধীনতা দিয়েছে আর ২০২৪ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে— রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল থেকে নয়, নাগরিকের বিশ্বাস থেকে আসে। আগামী বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হবে সেই বিশ্বাস রক্ষার সক্ষমতার ওপর।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক







