শিল্প মুনাফাভিত্তিক হতে পারে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমাদের এক গুণী প্রবীণ বন্ধু এক আড্ডায় বলেছিলেন, একবিংশ শতাব্দী হচ্ছে টাকার শতাব্দী। যা কিছু মহান শিল্প গড়ে উঠেছে কঠিন পথ ধরে, তা ঘটেছে বিংশ শতাব্দীতে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরও চলচ্চিত্রে, নাটকে, চারুকলায়, সংগীতে, নৃত্যকলায় অনেক বড় বড় সৃষ্টিশীল কাজ হয়েছে। সেই সৃষ্টিশীল কাজগুলো নিরিখ ছিল একটাই– মানুষের জন্য শিল্প। হলিউড, রাশিয়া, ইউরোপের দেশগুলো, মুম্বাই অথবা কলকাতা এমনকি ঢাকায়ও অনেক সৃষ্টিশীল কাজ হয়েছে। একমাত্র রাশিয়া ছাড়া কোথাও কোনো রাষ্ট্রীয় আর্থিক আনুকূল্য মেলেনি। কিন্তু যদি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিন্তা করা যায়, তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’ নির্বাক চলচ্চিত্রটি ছিল এক বিস্ময়কর নির্মাণ। অতি স্বল্প অর্থে নির্মিত ইতালিয়ান চলচ্চিত্র ‘বাইসাইকেল থিফ’ শৈল্পিক দিকের কারণেই সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেরণা এই ছবি থেকেই।
রাশিয়ার বিখ্যাত মননশীল উপন্যাসের চিত্ররূপও হয়েছিল হলিউড থেকে। সাহিত্যের চলচ্চিত্ররূপ এই শতাব্দীতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য এবং আমাদের বাংলা সাহিত্যও মানুষের মননসৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাহিত্যিকদের নিরলস পরিশ্রম এবং অতিনগণ্য পারিশ্রমিকের বিনিময়েও অনেক কালজয়ী শিল্পের সৃষ্টি হয়েছে।
লাতিন আমেরিকার সাহিত্যেও বিংশ শতাব্দী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চীনে বিপ্লবের আগেও সাহিত্য মানুষের জাগরণের জন্য নতুন নতুন প্রেরণার সৃষ্টি করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বাংলায় সাধারণ রঙ্গালয়ের কাজ শুরু হয়। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিংশ শতাব্দীতে একটি পেশাদার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই রঙ্গালয়ে আর্থিক কারণে নানা ধরনের জৌলুসপূর্ণ নাটকের অভিনয় হতো। কিন্তু তিরিশের দশকের শেষে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। তার মধ্য থেকেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে একদিকে যেমন দুর্ভিক্ষ, মানুষের জীবন-মরণের লড়াই; অন্যদিকে গণসাহিত্য, গণনাট্য এবং গণসংগীতের একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়। সেই সময়কার পালাবদলের নাটক নবান্ন মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বাংলা নাটক এক নতুন উচ্চতায় প্রবেশ করে, যার কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল না। এই সময়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একেবারেই তরুণ বয়সে দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকেন। সেই ছবি কালের যাত্রায় এক অসাধারণ চারুশিল্পের উদাহরণ সৃষ্টি করে। বাংলা নাটকের এই নতুন মোড় অবিভক্ত ভারতের শিল্পচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। বাংলা নাটকের এই ধারা ভারত ও বাংলাদেশের নাটককেও প্রভাবিত করে। চলচ্চিত্রেও এই প্রভাব লক্ষণীয়। এসব শিল্পচিন্তার পেছনে কোনো আর্থিক প্রণোদনা ছিল না। একদিকে শিল্পচিন্তা, অন্যদিকে মানুষের জন্য শিল্প বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছিল। যদিও এর পেছনে শিল্পস্রষ্টাদের শুধু পরিশ্রম নয়, আর্থিক সংকটও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে সব শিল্পমাধ্যমেই শিল্পীর আর্থিক বিবেচনার বিষয়টি দেখা যায়। উচ্চাঙ্গের শিল্পগুলো ছাড়া সব শিল্পেই পুঁজির লগ্নি হতে থাকে। পুঁজি বিনা মুনাফায় কোনো কাজ করতে নারাজ। তাই শিল্পের দুটি ধারাই প্রবণতা হিসেবে দেখা যায়। একদিকে মননশীল উচ্চাঙ্গের শিল্প, অন্যদিকে পুঁজির লগ্নিকরা শিল্প। এরই মধ্যে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাহিত্যের যে চর্চা হতো তা-ও পুঁজিবাদের প্রভাবে পড়ে যায়। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতনের মধ্য দিয়ে শিল্পেরও একধরনের সংকট দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় আর্থিক আনুকূল্যে সৃষ্টিশীল কাজ অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মস্কো ও চীনভিত্তিক কালজয়ী সাহিত্যের যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল, সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এসব দেশের যে রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল, তা নড়বড়ে হয়ে যাওয়াতে রাজনৈতিক প্রকাশনা, অর্থনীতির রাজনীতি— এসব ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার ঢেউ এসে লাগে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে; কিন্তু তারপরও শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা থেকে যায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দী শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রণোদনাভিত্তিক একটা প্রবণতা মুখ্য হয়ে ওঠে। সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত সরকারি উদ্যোগ থেকেই। সেখানে রাষ্ট্রের রাজস্বভিত্তিক একটি অনুসন্ধান করা হয়েছে; যেখানে শিল্পের কোনো শাখা আর্থিকভাবে লাভজনক, তার একটি খতিয়ান দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন ধরে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় একটি স্থূল ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যেখানে শিল্পের বিচার হয় ‘ভিউভিত্তিক’। দেশের রুচিশীল মানুষরা এই ভিউতে অংশগ্রহণ করেন না। আমি এই ভিউর ফলাফল সম্পর্কে বেশ কয়েক বছর আগে একটি মন্তব্য করেছিলাম। যদিও তা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বহুদিন আগের একটি মন্তব্য থেকে। বলেছিলাম, দেশে রুচির দুর্ভিক্ষ চলছে। যার ফলাফল, শিল্পের বিচার হয় ভিউ থেকে, যা কোনো সুস্থ বিবেচনাপ্রসূত নয়। কিন্তু যারা শিল্পের কর্মী, তাদের একটি অংশ এই ভিউভিত্তিক শিল্পে মনোযোগী হয়ে পড়ে। যার মধ্যে রুচিহীনতা, অশ্লীলতা, ভায়োলেন্স— এসব স্থান পেতে থাকে। ভিউর বিচারে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, জহির রায়হান এবং সাম্প্রতিককালে যারা সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র করছেন, তাদের অবস্থাটি কী দাঁড়াত বা কী দাঁড়াবে?
আজকের দিনে অনেক ধরনের সুবিধাবাদী শব্দচয়নের প্রবণতা বেড়েছে। সেই প্রবণতাগুলোর মধ্যে শিল্পের অনেক ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যে ব্যাখ্যাগুলো আসলে মানুষের চিন্তাকে গুলিয়ে দেয়। পৃথিবীর কোনো জায়গায় সত্যিকারের শিল্প কখনো পূর্ব নির্দিষ্ট মুনাফাভিত্তিক হতে পারে না
শুধু বিনোদনের জন্য চিরকালই একধরনের মানুষ শিল্পকর্ম করে এসেছে। এটি শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশেই তা লক্ষ করা যাবে। এই বিনোদনের কর্মীরা অবশ্যই প্রচুর অর্থের এবং জৌলুসপূর্ণ জীবনযাপন করে থাকেন। অন্যদিকে যারা মনন শিল্পের কাজ করে থাকেন, তারা কায়ক্লেশের জীবনযাপন করেন এবং কালজয়ী শিল্প নির্মাণ করেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের এই ঝোঁক নিতান্তই একটি পুঁজিবাদী ঝোঁক এবং রাষ্ট্রকে সেসব দিকে ধাবিত করা, যেখানে প্রচুর মুনাফার সম্ভাবনা আছে। গত শতাব্দীর শেষের দিক থেকে রাজনৈতিক কর্মীরা লেখাপড়া ও আদর্শিক জায়গা থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। সার্বক্ষণিকভাবে তারা দলীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে থেকে নতুন কোনো জ্ঞান অর্জনের উৎসাহী নয়। জ্ঞানচর্চার প্রবণতা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে একেবারেই কমে গেছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য জ্ঞানচর্চা একটি মুখ্য বিষয় ছিল। পরবর্তীকালেও, বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতিতে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একটি মুখ্য বিষয় ছিল। কিন্তু পরবর্তী ক্ষমতাসীন শাসকদের আমলে এ পরিস্থিতির ব্যপক অধঃপতন লক্ষ করা যায়।
একসময় তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দিকদর্শন যেমন পাওয়া যেত, তেমনি শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও তারা একটি মুখ্য ভূমিকা রাখত। সংস্কৃতির নির্মাণে তারা সবসময়ই একটি ইতিবাচক ধারা সামনের দিকে নিয়ে যেত। বর্তমানে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের ফলে এক অন্ধকার সময়ের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসের চাকা যখন পেছনের দিকে ঘুরছে, তখন প্রয়োজন ছিল এই তরুণদের হাতে মননশীল সংস্কৃতির পক্ষে একটি দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ। কিন্তু সেখানেও সত্যের প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলছে। এ কথা সত্য, মিথ্যা প্রলয়ংকরী, কিন্তু সত্য সে ক্ষেত্রে টিমটিম করে জ্বললেও একসময় তা বিশাল আলোতে পরিণত হয়। এই প্রমাণ আমাদের ইতিহাসে বহুবার পেয়েছি। আবার আজকের দিনে অনেক ধরনের সুবিধাবাদী শব্দচয়নের প্রবণতা বেড়েছে। সেই প্রবণতাগুলোর মধ্যে শিল্পের অনেক ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যে ব্যাখ্যাগুলো আসলে মানুষের চিন্তাকে গুলিয়ে দেয়। পৃথিবীর কোনো জায়গায় সত্যিকারের শিল্প কখনো পূর্ব নির্দিষ্ট মুনাফাভিত্তিক হতে পারে না। আজকের দিনে প্রযুক্তির এক ভয়াবহ উল্লম্ফনের কারণে অনেক শিল্পের সৃষ্টি হচ্ছে, যা কখনো ক্ষণস্থায়ী, আবার কখনো তার নিজস্ব গুণেই দীর্ঘস্থায়ী হয়। চলচ্চিত্র অনেক বিনোদনধর্মী কাজ, বিষয়বস্তুও খুব গুরুত্বপূর্ণ। হলিউড বা মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রে দেখা গেছে, একেবারেই অল্প অর্থে নির্মিত, কিন্তু বিষয়বস্তুর কারণে তা জননন্দিত হয়েছে। সেখানে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ কেউ দেখছে না। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে ইরানি ও দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র। শুধু তাই নয়; নাটক, সংগীত, চারুকলা, সাহিত্য— এসব ক্ষেত্রেও শিল্পীদের নিরলস প্রচেষ্টার মধ্যেই সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটে। তাই সৃজনশীল অর্থনীতির বিবেচনা এখানে একেবারেই প্রগতিবিরোধী। আর বাজার অর্থনীতির নিরিখে শিল্পের বিবেচনা একেবারেই সুস্থ চিন্তা নয়।
লেখক: নাট্যকার





