টার্মিনাল স্থানান্তর যানজটের ওষুধ নাকি ভুল চিকিৎসা?

সংগৃহীত ছবি
ঢাকার যানজট কমাতে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাঁচপুরে নতুন টার্মিনালের কাজ এগিয়ে চলছে। কেরানীগঞ্জের বাঘৈর, সাভারের হেমায়েতপুর ও তুরাগের ভাটুলিয়াতেও টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য ঢাকার ভেতরে আন্তঃজেলা বাসের চাপ কমানো। উদ্দেশ্যটি যৌক্তিক। কিন্তু এর আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন—ঢাকার যানজটের সমস্যা কি টার্মিনালের অবস্থান, নাকি টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি?
ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোর বাস্তব চিত্র দেখলে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। টার্মিনাল মূলত যাত্রী ওঠানামা ও ট্রিপ পরিচালনার স্থান। আর ডিপো হলো বাস রাখার স্থান। কিন্তু ঢাকায় টার্মিনালগুলো দীর্ঘসময় বাস পার্ক করে রাখার জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। টার্মিনালের জায়গা দখল করে রাখার পাশাপাশি প্রধান সড়কেও বাস দাঁড়িয়ে থাকে। এতে সড়কের চলাচল সক্ষমতা কমে এবং টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় যানজট বাড়ে।
সমস্যার একটি বড় অংশ যদি অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও ডিপো ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সমাধান হিসেবে পুরো টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার আগে শহরের বাইরে পর্যাপ্ত ডিপো ও পার্কিং সুবিধা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। বাসগুলো ট্রিপের বাইরে ডিপোতে থাকবে। নির্ধারিত সময়ের আগে টার্মিনালে এসে যাত্রী তুলবে এবং ট্রিপ শেষে আবার ডিপোতে ফিরে যাবে। এতে টার্মিনালে দীর্ঘসময় বাস রাখার প্রয়োজন কমবে এবং সড়কের ওপর পার্কিংও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
ঢাকার যানজটের সমাধান শুধু টার্মিনালের ঠিকানা পরিবর্তনের মধ্যে নেই। বাস কোথায় থাকবে, টার্মিনালে কতক্ষণ থাকবে এবং টার্মিনাল থেকে যাত্রী কীভাবে তার গন্তব্যে পৌঁছাবেন—এই তিনটি প্রশ্নের সমন্বিত সমাধানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বের অনেক বড় শহরেও নগরের ভেতরে আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল রয়েছে। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন এবং নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের মিডটাউন বাস টার্মিনাল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব শহরে টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বাসের চলাচল ও পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী ওঠানামা এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একটি টার্মিনাল কোথায় থাকবে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং পুরো পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত থাকবে।
ঢাকার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শহরের অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন এখনো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শহরের প্রান্তে নতুন টার্মিনাল তৈরি করার আগে সেখান থেকে যাত্রীদের ঢাকার বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ভোররাত বা রাতে দূরপাল্লার বাসে আসা নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু ও পরিবারসহ যাত্রীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কাঁচপুর বা হেমায়েতপুরে নেমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন না পেলে তাদের অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে সময় ও ব্যয় বাড়বে; নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আসবে।
আরেকটি বিষয় হলো ঢাকার প্রবেশপথে যানজটের সম্ভাব্য চাপ। কাঁচপুর, আমিনবাজার বা টঙ্গীর মতো এলাকায় বিপুলসংখ্যক বাস ও যাত্রী কেন্দ্রীভূত হলে সেখানে নতুন করে যানজট তৈরি হতে পারে। শহরের ভেতরের যানজট কিছুটা কমলেও তা যদি প্রবেশপথে গিয়ে জমে, তাহলে সামগ্রিকভাবে যানজটের সমাধান হবে না। বরং সমস্যার স্থান পরিবর্তন হতে পারে।
এ কারণে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরকে আলাদা কোনো অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে না দেখে ঢাকার সামগ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শহরের বাইরে পর্যাপ্ত ডিপো ও পার্কিং সুবিধা, টার্মিনালে বাসের অবস্থানের সময় নিয়ন্ত্রণ, বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং মেট্রোরেল, বিআরটি ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ—এসব বিষয় একই পরিকল্পনার আওতায় আনা দরকার।
ঢাকার যানজটের সমাধান শুধু টার্মিনালের ঠিকানা পরিবর্তনের মধ্যে নেই। বাস কোথায় থাকবে, টার্মিনালে কতক্ষণ থাকবে এবং টার্মিনাল থেকে যাত্রী কীভাবে তার গন্তব্যে পৌঁছাবেন—এই তিনটি প্রশ্নের সমন্বিত সমাধানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান না করে শুধু টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নিলে যানজট কমার বদলে তা অন্য জায়গায় গিয়ে তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
লেখক: সভাপতি, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন






