সিসাদূষণ নিয়ে যে কথাগুলো কেউ বলছে না

অদৃশ্য বিপদের একটি নাম— সিসাদূষণ। বর্তমানে এটি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছেই। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় ৫০০ শিশুর মধ্যে ৯৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা নিরাপদসীমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পাওয়া গেছে। ২০২২-২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের নিয়ে এই গবেষণা চালানো হয়। দেশে সাড়ে তিন কোটির বেশি শিশুর রক্তে সিসার উপস্থিতি রয়েছে বলে জানাচ্ছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ— এ তথ্য ২০২৪ সালের। সংস্থাটির মতে, শিশুদের রক্তে সিসার কোনো মাত্রাকেই নিরাপদ বলা যায় না। ২০২০ সালে ইউনিসেফ বিশ্ব জুড়ে সিসাদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সে তালিকায় বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আন্তর্জাতিকভাবে এমন উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আসার পরও দেশে শিশুদের সিসার সংস্পর্শ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পর্যায়ে যথেষ্ট সমন্বিত উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এমনকি এই দূষণের জন্য দায়ী শিল্প ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর অর্থায়নে অর্থনীতিবিদ বিয়র্ন লারসেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে সিসাদূষণের কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে বিপুল ক্ষতি হয়েছে। শৈশবে সিসাদূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানগত সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে কর্মজীবনে যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়, তার আর্থিক ক্ষতিও বিপুল। অর্থাৎ সিসাদূষণ শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি আঘাত।
নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগে, শিশুদের রক্তে এত সিসা এলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আইসিডিডিআর,বি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার বিষক্রিয়ার কারণ নির্ণয়ের জন্য যৌথভাবে গবেষণা করেছিল
নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগে, শিশুদের রক্তে এত সিসা এলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আইসিডিডিআর,বি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার বিষক্রিয়ার কারণ নির্ণয়ের জন্য যৌথভাবে গবেষণা করেছিল। সম্ভাব্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিংয়ের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ, ইলেকট্রনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ, সিসাযুক্ত রঙ, সিসার ভেজালযুক্ত হলুদ, অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র, তাবিজ, প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রঙ, ধাতব জুয়েলারি, প্রসাধনসামগ্রীসহ বিভিন্ন উৎস।
গাজীপুরের শিল্প এলাকা টঙ্গীতে ২০০৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষিত ১০৫ শিশুর মধ্যে ১০৪ জনের রক্তে সিসার মাত্রা ছিল ১০ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। সে সময়ের গবেষণায় শিশুর আচরণ ও জ্ঞানগত ক্ষতির সঙ্গে এমন মাত্রার সিসা-সংস্পর্শের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। বাংলাদেশে সিসাদূষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিয়ন্ত্রিত রিসাইক্লিং। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় কোনো ধরনের পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম বা নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এসব ব্যাটারি
কিন্তু এখানে এমন একটি প্রশ্ন আছে, যা নিয়ে আমরা খুব কমই আলোচনা করি— আজকের ব্যাটারিগুলো আগামী দিনের দূষণ তৈরি করবে না তো? ঢাকা শহরসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এসব যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারি একটি নির্দিষ্ট সময় পর অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলো কীভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও নিরাপদে রিসাইক্লিং করা হবে— এ বিষয়ে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থাপনা না থাকলে ভবিষ্যতে ব্যবহৃত ব্যাটারির বিশাল একটি অংশ
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো খাদ্যপণ্য, প্লাস্টিকের খেলনা এবং রঙ বা পেইন্টে সিসার উপস্থিতি। কারণ, সিসা শুধু কারখানার শ্রমিক বা দূষিত এলাকার মানুষের সমস্যা নয়; দৈনন্দিন জীবনের পণ্য ব্যবহার করেও মানুষ এর সংস্পর্শে আসতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সিসা শরীরে প্রবেশ করার পর এটি ক্যালসিয়ামের মতো আচরণ করতে পারে এবং শিশুর বিকাশমান স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, আচরণ ও জ্ঞানীয় বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে
সিসাদূষণের আরেকটি দিক হলো সামাজিক বৈষম্য। যেসব শিশু দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করে, সেখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিসাদূষণ কমাতে ব্যয় করা অর্থ শুধু স্বাস্থ্য খাতে খরচ নয়; এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদে বিনিয়োগ। যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সিসাদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে ব্যয় ও সুফলের অনুপাত প্রায় ১৭:১; অর্থাৎ প্রতিরোধে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে ১৭ টাকার সুফল মেলে। তাই সিসাদূষণ প্রতিরোধকে ব্যয়
লেখক: শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ



