চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির সমস্যা বাড়ছে, কী শিখতে পারে বিশ্ব?

ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে চার্জিংয়ের চাহিদা বাড়ায় হারবিনের একটি ফাস্ট-চার্জিং পয়েন্টে বৈদ্যুতিক গাড়ির সারি দেখা যায়। ছবি : সিএনএ
চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হারবিন শহরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় গাড়িতে বসে আছেন ঝাও লি। মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সঙ্গে রাস্তায় পড়ছে তুষার।
এমন প্রতিকূল আবহাওয়ায় লি তার বৈদ্যুতিক গাড়িতে (ইভি) বসে সময় পার করছেন। ট্রাফিকের জন্য নয়, বরং রাস্তার পাশের চার্জিং স্টেশনে অপেক্ষা করছেন লি।
৪৫ বছর বয়সী পেশাজীবী লি পেট্রোলের খরচ বাঁচাতে কিনেছিলেন এই ইভিটি। পেট্রোলচালিত একটি হাইব্রিড গাড়িও আছে তার।
লির ইভি চার্জ করতে খরচ হয় ১০০ ইউয়ানের (১৪.৪০ মার্কিন ডলার) কম। অন্যদিকে গাড়ির ৫০ লিটারের ট্যাংকে পেট্রোল ভরতে তার খরচ হতো ৩৫০ ইউয়ান।
লি অবশ্য তাতে খুশি নন। তার আক্ষেপ, কে জানত যে তেলের বদলে চার্জ দিতেই এত বেশি সময় নষ্ট হবে। সময় মানেই টাকা- আমার মনে হয় আমি যা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি হারিয়েছি।তার দাবি, ফাস্ট-চার্জিং স্টেশনে সাধারণত চার্জ দিতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগে।
ইভির আরও একটি বড় সমস্যা নিয়ে বেশ হতাশ লি। তার ভাষ্য, ডিসপ্লেতে যে দূরত্বের কথা বলা হয়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম যেতে পারেন লি। চরম ঠাণ্ডায় এ সমস্যা আরও বাড়ছে বলে মত তার।
ইভির বিজ্ঞাপনে, প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্বে যাওয়া কথা বলা হয় একবার ফুল চার্জে। লির পুরো সপ্তাহের কাজ ও দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য যা যথেষ্ট ছিল।
দুই বছর আগে ব্র্যান্ড নিউ গাড়িটি কিনেছিলেন লি। হতাশার সুরে তার দাবি, ঠাণ্ডা আবহাওয়া ও গাড়ি যত পুরনো হচ্ছে , প্রতিশ্রুতির অর্ধেকও পাচ্ছি না। এখন সপ্তাহে প্রায় দুবার চার্জ দিতে হচ্ছে তাকে।
বেশিরভাগ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ছোট ট্রিপের জন্য শুধু ইভি ব্যবহার করেন লি। লম্বা দূরত্বের জন্য আগের হাইব্রিড গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাকে।
চীনের তৈরি ইভি বাজারে আসার পর লি প্রথম দিকের ব্যবহারকারীদের একজন। তার হতাশা অধিকাংশের বাস্তব অভিজ্ঞতা।দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এক দশক ধরে দ্রুত জনপ্রিয় হয় ইভি। তেলের চেয়ে কম খরচ, আরামদায়ক পরিবেশ এবং দ্রুতগতির প্রতিশ্রুতির কারণে ঘটে এটি।
এ ছাড়া পেট্রোলচালিত গাড়ির তুলনায় ইভির পার্টস রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কম হওয়ার কথাও বলা হয় বিজ্ঞাপনে।
এই সুবিধাগুলো এখনও ভালোভাবে কাজ করছে ছোট দূরত্বের যাতায়াতের জন্য। কিন্তু ইভির ব্যাটারি পুরনো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা।
গুয়াংজু-ভিত্তিক ব্যাটারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লিডইনক্স এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মেই আও ব্যাখ্যা করেন, ইভি পুরনো হতে থাকলে আবহাওয়া চাপে ব্যাটারি ক্লান্ত হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে দুর্বল হয়ে শক্তি হারাতে থাকে। বিশেষ করে চীনের উত্তর-পূর্বের হাড়কাঁপানো শীতে এটি আরও বেশি হয়।
ব্যাটারি নষ্ট হওয়া বা কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সাধারণ দুটি প্রধান উপায় ধরা পড়েছে তার কাছে। মেই আও দাবি করেন, সক্ষমতা কমে গেলে ব্যাটারি কম শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। অন্যদিকে, সময় বাড়লে অভ্যন্তরীণ জটিলতা বেড়ে যাওয়া, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
এর মানে গতি কমে যাওয়া এবং বড় দূরত্বে যাওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া।
মেই আরও যোগ করেন, ঠাণ্ডা আবহাওয়া ব্যাটারির ক্ষমতা কমিয়ে দেয় তা ঠিক, কিন্তু ইভি চালু করতে ওই সময় অতিরিক্ত হিট প্রয়োজন হয়। এ শক্তি ব্যাটারি থেকেই যায়।
তার মত, মাইনাস ১০ ডিগ্রি বা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ব্যাটারির সক্ষমতা হয়তো মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমতে পারে, কিন্তু অনেক বেশি শক্তি হিটিং বা গরম করায় চলে যায়।
এ কারণে ইভি ব্যবহারকারীরা মনে করেন, গাড়ির ক্ষমতা অর্ধেক কমে গেছে।
তীব্র ঠাণ্ডায় চার্জ দিলে ব্যাটারি ঠিকমতো তা নিতে পারে না, যা স্বাস্থ্যের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে—এমন দাবি সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক হাং দিন নগুয়েনের।
তার মত, এটি ব্যাটারির স্থায়ীভাবে ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। পরিবেশগত প্রতিকূলতার পাশাপাশি বয়স বেড়ে যাওয়া ইভির মালিকদের জন্য একটি নীরব কিন্তু ব্যয়বহুল পরীক্ষা হিসেবে সামনে আসছে।২০২০ সালের আগস্টে ইভি কিনেন ৩০ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা শন পেং। তার দাবি, গাড়িটি পুরোনো হয়ে যাওয়ার লক্ষণগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।তার ভাষ্য, গাড়িটির অপারেটিং সিস্টেম ধীরে সাড়া দেয় এবং এর ড্রাইভিং রেঞ্জ প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে।চার্জিং পারফরম্যান্সও খারাপ হয়ে গেছে বলে জানান পেং। তার আক্ষেপ, সাধারণ চার্জিং পয়েন্টে গাড়িটি এখন অনেক ধীরে চার্জ হয়। তিনি প্রস্তুতকারক সংস্থাকে বিষয়টি জানালে তাকে বলা হয়, ওয়্যারিং পরিবর্তন করে এটি ঠিক করা যাবে। ওই সমস্যাগুলো সমাধান করা সস্তা না।গাড়িটি এখন আর ওয়ারেন্টির আওতায় না থাকায় পেংকে জানানো হয়, মেরামতের জন্য কয়েক হাজার ইউয়ান খরচ হতে পারে এবং এই খরচ তাকেই বহন করতে হবে।চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির ওয়ারেন্টি সাধারণত প্রায় আট বছর বা ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত থাকে। অন্যদিকে গাড়ির অন্য বেশিরভাগ যন্ত্রাংশের ওয়ারেন্টি প্রস্তুতকারক ভেদে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য দেওয়া হয়।কিন্তু গাড়িটি কেনার সময় এই খরচগুলোর কথা সেভাবে ভাবেননি পেং।তার প্রত্যাশা ছিল ব্র্যান্ডটি বড় ধরনের ত্রুটি এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যার বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা দেবে।চীনের ইভির বাজারে ক্রমশ এ দিকটি নেতিবাচক হয়ে প্রভাবক হয়ে উঠেছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি ইভি স্টার্টআপ হয় বন্ধ হয়ে গেছে অথবা তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছে। যা বর্তমান মালিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা নিয়েও তুলেছে প্রশ্ন।কিন্তু সফটওয়্যার ও সেবা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ঝুঁকির একটি অংশ মাত্র। যদি ব্যাটারি বদলানোর বিষয়টি আসে, তাহলে আর্থিক ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।চীনের শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী, মডেল এবং ব্যাটারির আকারের ওপর নির্ভর করে একটি সম্পূর্ণ ইভি ব্যাটারি প্যাক বদলাতে ৫০ হাজার ইউয়ান থেকে ১ লাখ ইউয়ানেরও বেশি খরচ হয়।এই অঙ্কটি একটি পুরোনো গাড়ির মূল্যের কাছাকাছি বা এমনকি তার চেয়েও বেশি হতে পারে।তুলনা করলে দেখা যায়, চীনে একটি পুরনো ইভির দাম সাধারণত প্রায় ১ লাখ থেকে দেড় লাখ ইউয়ান হয়ে থাকে। শুধু ব্যাটারি বদলানোর খরচই একটি নতুন করে পুরনো গাড়ি কেনার খরচের বড় অংশ হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমনকি তার সমানও হতে পারে। এর ফলে, বেশিরভাগ মালিক ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পুরোনো ব্যাটারি বদলান না। তারা বরং গাড়ি ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তন আনেন। ইভি ব্যাটারি শিল্পের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব মেই অভিজ্ঞতার আলোকে দাবি করেন, গাড়ির মালিকরা নতুন ব্যাটারি বদল না করে কম দূরত্বে গাড়ি চালান, ঘন ঘন চার্জ দেন অথবা তাদের যানবাহন বিক্রি করে দেন।পুরোনো পেট্রোল গাড়ির তুলনায় ইভি মালিকদের মেরামতের ব্যয় অনেক বেশি। যার মধ্যে ব্যাটারি বদলানো সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকি।মেই জোর দেন, এসব আর্থিক ঝুঁকি নতুন ইভি ক্রেতাদের জন্য বিবেচ্য হয়ে উঠছে। তার পরামর্শ , পুরোনো ব্যাটারির ঝুঁকি ব্যক্তিগত মালিকদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে, এর কার্যকারিতাকে বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে, তখনই বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার সফল হবে।একটি গাড়ির সম্পূর্ণ জীবনকাল জুড়ে মালিকদের সহায়তা করার জন্য ভালোভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, না হলে প্রাথমিক কেনাকাটার জোয়ারের পর ইভি বিক্রি অপ্রত্যাশিত কমে যাওয়ার ভয় আছে।
সূত্র: সিএনএ থেকে অনূদিত















