যে যুদ্ধ ভাঙার বদলে আরও শক্ত করল ইরানকে

ফেব্রুয়ারির এক গোপন আলোচনা, যেখানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝালেন— ‘এটাই সুযোগ। আঘাত করলেই ইরানের ভেতর থেকে বিদ্রোহ উঠবে, সরকার ভেঙে পড়বে।’ ‘পাগলাটে’ ট্রাম্পও রাজি হয়ে গেলেন। পরিকল্পনা তৈরি হলো। টার্গেট ঠিক হলো, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র। তারপর? মেঘের ওপর ভাসল যুদ্ধবিমান। মিসাইল ছুটল। আগুনে জ্বলে উঠল তেহরান; খবর এলো— ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আর নেই। বিশ্ব থমকে গেল। সবাই ভাবল, ‘এবার শেষ! ইরান ভেঙে পড়বে।’ কিন্তু চিত্রনাট্যে সাসপেন্স; গল্পের মোড় ঘুরে গেল এখানেই।
খানিকটা খোলাসা করে বলা যাক, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা শুরু করল, তার আগে ইরান ছিল ভেতর থেকে কাঁপতে থাকা এক দেশ। রাস্তায় নেমেছিল হাজারো মানুষ। বিদ্রোহ দমাতে বন্দুকের নল থেকে ঠা ঠা ছুটে গেল গুলি। মারা গেল কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। নিত্যপণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছিল। টাকার মূল্য পড়ে যাচ্ছিল প্রতিদিন। এসবের সঙ্গে, নারীরাও হিজাব খুলে বের হচ্ছিল রাস্তায়, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। খামেনির মুঠোয় থাকা সরকার বুঝতে পারছিল— ‘কিছু না বদলালে টিকে থাকা কঠিন হবে।’ তাই তারাও একটু নরম হচ্ছিল। কিছু নিয়মকানুন শিথিল করছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার কথাও ভাবছিল। মনে হচ্ছিল, ইরান বদলাতে চলেছে।
এরপর? সেই হামলা আর যুদ্ধ; সবকিছু থামিয়ে দিল। বাইরের আঘাত এক অদ্ভুত কাজ করল—ভেতরের ভাঙন যেন বন্ধ হয়ে গেল। ইরানের সাধারণ মানুষ ভাবল— ‘এখন সরকার না, দেশটাই রক্ষা করতে হবে।’ ঠিক তখনই সামনে এলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)। তারা নিয়ন্ত্রণ নিল সবকিছুর। রাজনীতি, নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত— সব।
কীভাবে তা হলো? ফরেন অ্যাফেয়ার্সের নিবন্ধের আলোকে তা-ই জানার চেষ্টা করব।
ভুলটা কোথায় হয়েছিল?
ফরেন অ্যাফেয়ার্স বলছে, ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর প্রত্যাশা ছিল, সামরিক চাপ ও নেতৃত্বশূন্যতা ইরানে ভেতর থেকে বিদ্রোহ সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেই চাপই কট্টরপন্থী শক্তির উত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সংগঠিত করেছে।
যুদ্ধের আগে ইরান গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ডুবে ছিল। ২০২৫ সালে দেশটির মুদ্রার মান অর্ধেকে নেমে আসে এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালে অর্থনীতির সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এই অর্থনৈতিক চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলছিল সাধারণ মানুষের জীবনে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈধতার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের সামান্য বেশি ছিল—১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যা সর্বনিম্ন। এটি জনআস্থার সংকটের ইঙ্গিতই বহন করে।
সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব ছাড়া বের হচ্ছিলেন, তরুণদের মধ্যে সামাজিক বিধিনিষেধ অমান্যের প্রবণতা বাড়ছিল। সরকার এসব পরিবর্তনের চাপ অনুভব করে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিতে শুরু করে। কঠোর হিজাব আইন বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার কথাও বিবেচনায় আসে।
তবে এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে লক্ষাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সরকার কঠোর দমনপীড়নের মাধ্যমে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনলেও রাষ্ট্রের ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ পরিস্থিতিতে বাইরের সামরিক আঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ ‘র্যালি অ্যারাউন্ড দ্য ফ্লাগ’ প্রভাব সৃষ্টি করে— অর্থাৎ, বাইরের হুমকি সামনে এলে জনগণ ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ বিভাজন ভুলে একত্র হয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেকেই রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে অভ্যন্তরীণ চাপ কমে যায় এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ক্ষমতার ভারসাম্যে। ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি দ্রুত কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। তারা শুধু নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব বাড়ায়। প্রেসিডেন্সি ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের প্রভাব বাড়ে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়াও দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে শেষ হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যেখানে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বিকল্প বা প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতির পেছনে একটি বড় কৌশলগত ভুল ছিল ইরানকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করা। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করেছিল, ইরানও একটি নেতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা, যেখানে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল। এখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক বাহিনী এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামো মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক ক্ষমতা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ফলে একজন নেতার মৃত্যু পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেনি; বরং অন্য অংশগুলো দ্রুত শূন্যস্থান পূরণ করে নিয়েছে।
আরও কঠোর ও সামরিকীকৃত রাষ্ট্র
যুদ্ধ-পরবর্তী বা এখন ইরানের ক্ষমতার মূল এখন আগের তুলনায় আরও কেন্দ্রীভূত এবং সামরিকীকৃত হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়ায় নীতিনির্ধারণে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট। তাদের আঞ্চলিক নীতিতেও পরিবর্তন দেখা গেছে। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেনি। অতীতে যেখানে নেতৃত্ব সতর্কতার সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করত, সেখানে নতুন নেতৃত্ব ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী; অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে। দেশের ভেতরেও ভিন্নমত দমনে কঠোরতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল করার সম্ভাবনাও রয়েছে, বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে গেলে।
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ
যুদ্ধ ইরানকে কিছু অপ্রত্যাশিত সুযোগও এনে দিয়েছে। চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ শুরু হয়েছে, যেখানে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। যদি এই আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমে, তবে তা ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নতি হলে জনঅসন্তোষ কমতে পারে এবং সরকারের বৈধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়ছে
বিশ্লেষকদের চোখে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। খামেনি জীবিত থাকাকালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। তবে তার মৃত্যুর পর সে নীতিগত সীমাবদ্ধতা আর কার্যকর নাও থাকতে পারে।
বর্তমানে ইরানের কাছে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে। নতুন নেতৃত্ব যদি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা আগের তুলনায় বাড়বে নিশ্চিত। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, উত্তর কোরিয়ার অভিজ্ঞতা ইরানকে এই পথে উৎসাহিত করতে পারে— যেখানে পারমাণবিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিরোধ ও দরকষাকষির শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
সামনে কী?
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র একই কৌশলগত ভুল— অর্থাৎ ইরানকে নিজেদের মতো বোঝা অব্যাহত রাখে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়বে। অন্যদিকে, যদি একটি সমঝোতা হয়, তবে সেটিও ইরানের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে—
বাইরের সামরিক চাপ সবসময় সরকার পতন ঘটায় না। অনেক ক্ষেত্রে তা উল্টো রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল একটি শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, সেটিই এখন সে ব্যবস্থাকে আরও সংহত, আরও সামরিকীকৃত এবং সম্ভবত আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। এখন একটা প্রশ্ন সবার মস্তিষ্কের গলিপথে ঘুরপাক খাচ্ছে— ‘এই ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে?’ উত্তরটা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর।
লেখক: উপ-বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়



