যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: সংঘাতের ইতিহাসের শেষ ধাপ!

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রচেষ্টা কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে রক্তাক্ত সমাপ্তি দেখল বিশ্ব। শনিবার দেশটির নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যৌথ হামলা পরিচালনা করা হয় যার সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। হামলা শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত শুরু হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই হামলা নিরাপত্তা হুমকি কমাবে এবং ইরানিরা তাদের শাসকদের উৎখাত করার সুযোগ পাবে। আর এই সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কায় তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব দেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। যদিও জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থিত মাার্কিন সামরিক উপস্থিতি টার্গেট করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে কি পশ্চিমা শক্তিদের সংঘাতের এখানেই শেষ? শুধু কি সরকার পরিবর্তনই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল? ভৌগলিকভাবে ইরান একটি বড় তেল উৎপাদক দেশ এবং হরমুজ প্রণালীর বিপরীতে অবস্থিত। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং দাম বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলি খামেনির মৃত্যুতে প্রায় ৫০ বছরের ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থা চরম অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশ নিয়ন্ত্রণকারী ধর্মতান্ত্রিক শাসনের দ্রুত অবসান ঘটবে।
ইরানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা এতদিন সর্বোচ্চ নেতার হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর একবারই এমন বড় ক্ষমতা পরিবর্তন ঘটেছিল।
শনিবার খামেনির মৃত্যু ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। তবে তার সুস্পষ্ট কোনো উত্তরসূরি নেই। দীর্ঘদিন ধরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছিল, কিন্তু তিনি ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন।
এরপর খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায়। তিনি আড়ালে থেকে প্রভাব বিস্তারকারী এক ব্যক্তি এবং তার পিতার সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে ধারণা করা হয়। তবে তিনিই একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী নন। গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় খামেনি নাকি তিনজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্ধারণ করেছিলেন, যদিও তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
উত্তরাধিকার নিয়ে এই অনিশ্চয়তার সুযোগ নিতে পারে ইরানের শাসনবিরোধীরা। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানিদের শাসন উৎখাতের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ করলে তোমরাই তোমাদের সরকার গ্রহণ করো… সম্ভবত প্রজন্মের মধ্যে এটিই তোমাদের একমাত্র সুযোগ।’
তবে খামেনির নেতৃত্বাধীন ধর্মতন্ত্র বহু সংকটেও টিকে থেকেছে—২০০৯ সালের নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক দেশব্যাপী বিক্ষোভ পর্যন্ত। জানুয়ারিতে সরকার কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের (এফডিডি) ইরানবিষয়ক পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, ‘খামেনি-পরবর্তী ইরান মানেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী ইরান নয়। এই শাসনব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাপের মধ্যেও টিকে থাকতে পেরেছে।’
তিনি যুক্তি দেন, আন্তর্জাতিক চাপে পড়েও তেহরান বহু বছর ধরে তার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যেতে পেরেছে। পাশাপাশি সরকার বারবার কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করেছে।
খামেনির আমলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে। অভ্যন্তরে নাগরিক স্বাধীনতা, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়।
এই দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জনরোষ ক্রমেই বাড়ে, আর সরকারের প্রতিক্রিয়াও হয় আরও নির্মম। ডিসেম্বর মাসে নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে এবং আরও হাজারও মানুষকে গ্রেপ্তার করে।
শাসন পতন হলে ক্ষমতা গ্রহণে প্রস্তুত ব্যক্তিরাও আছেন। ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা শাহ পাহলভী হামলার পরপরই বিবৃতি দিয়ে বলেন, শাসনব্যবস্থা ‘ধসে পড়ছে’ এবং তিনি ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ হিসেবে প্রশংসা করেন। তিনি জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। তবে নির্বাসিত এই যুবরাজের প্রতি ইরানিদের প্রকৃত সমর্থনের মাত্রা স্পষ্ট নয়।
স্পষ্ট ক্ষমতা হস্তান্তর না হলে ইরানের এলিট সামরিক বাহিনী আইআরজিসি নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিত দেন যে প্রশাসন হয়তো ভেনেজুয়েলার মতো নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে।
আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত কঠোর সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানও বহাল থাকবে।
জানুয়ারিতে সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির শুনানিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো রুবিও স্বীকার করেন, খামেনির মৃত্যুর পর কে ক্ষমতা নেবে তা ‘খোলা প্রশ্ন’। তবে এটা এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে, হামলা শুরুর পর থেকে ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। কিছু বড় তেল কোম্পানি ও ট্রেডিং হাউজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত সীমিত থাকলেও ব্রেন্টের দাম ৮০ ডলারে পৌঁছাতে পারে; আর সরবরাহ ব্যাহত হলে তা ১০০ ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে ০.৬–০.৭ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করতে পারে।
এই সংঘাত বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। মুদ্রাবাজার, শেয়ারবাজার এবং বন্ডবাজারে ওঠানামা তীব্র হতে পারে। ডলারের মান পরিস্থিতির স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করবে। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র, যা এখন জ্বালানির নেট রপ্তানিকারক, তুলনামূলকভাবে লাভবান হতে পারে।
‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে বিবেচিত সুইস ফ্রাঁ, স্বর্ণ ও রূপার চাহিদা বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের চাহিদাও বাড়তে পারে। তবে বিটকয়েন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে আচরণ করছে না; এর দাম কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শেয়ারবাজার—বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারের বাজার—বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের প্রাথমিক সূচক দেবে। সংঘাত বাড়লে উপসাগরীয় শেয়ারবাজার ৩–৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক এয়ারলাইন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ওপর চাপ পড়তে পারে। বিপরীতে, ইউরোপীয় অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের চাহিদা বাড়তে পারে।




