পাশে বন্ধু, পকেটে বিকল্প নিয়ে মক্কা চুক্তি

সংগৃহীত ছবি
পৃথিবীতে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিশ্বাসের বাজারে এখন মন্দা। আগে দেশগুলো বন্ধু বানাত। এখন বানায় বিকল্প। এক বন্ধু বিপদে না এলে আরেকটি আছে; সেটিও ফোন না ধরলে তৃতীয় নম্বর পকেটে রাখা নিরাপদ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রেম নেই, আছে বিমা। একটি পলিসি আমেরিকার কাছে, একটি চীনের কাছে, আরেকটি নিজের পাড়ার শক্তিশালী প্রতিবেশীর কাছে।
এই নতুন ধারা বন্ধুত্বের পৃথিবীতেই ৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে বসেছিলেন তিনজন রাষ্ট্রনায়ক। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সামনে কাগজ। পেছনে পতাকা। তারপর স্বাক্ষর হলো মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট (এমজেডিএ) ।
চুক্তির বাক্যটি ছোট, কিন্তু ওজন ভারী। ‘তিন দেশের একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটি সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে’। শুনতে বেশ সিরিয়াস, ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর মতো। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও রয়টার্সকে বলেছেন, নীতিগত ও কারিগরি অর্থে এর সঙ্গে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারার মিল রয়েছে। এখান থেকেই বাজারে নতুন নাম ছড়িয়ে পড়ল এটা হতে চলছে ‘ইসলামি ন্যাটো’।
নামটি চমৎকার। লক্ষ্যও মহৎ। সংবাদপত্রের শিরোনামেও জমে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি শিরোনামে চলে না। ন্যাটো শুধু শব্দ বা সংস্থা নয়। তার পেছনে সাত দশকের প্রতিষ্ঠান, যৌথ সামরিক কমান্ড, গোয়েন্দা কাঠামো, সমন্বিত যুদ্ধপরিকল্পনা, ঘাঁটি, মহড়া এবং কে কখন কী করবে তার বহু স্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। মক্কা চুক্তি এখনো সেই জায়গায় পৌঁছায়নি। ফলে তাকে আজই ‘নতুন ন্যাটো’ বলা অনেকটা বাড়ির ভিত্তি খুঁড়েই ড্রয়িংরুমের পর্দার রং নিয়ে আলোচনা করার মতো।
আগামীকাল যুদ্ধ লাগলে কে কার হয়ে গুলি চালাবে- এটা না দেখে দেখতে হবে, আগামী পাঁচ বছরে কী হয়। একটি স্থায়ী সচিবালয় তৈরি হয় কি না। যৌথ কমান্ড দাঁড়ায় কি না। তিন দেশের সামরিক বাহিনী নিয়মিত মহড়া করে কি না। সৌদি অর্থে তুরস্ক-পাকিস্তান যৌথ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প তৈরি হয় কি না। গোয়েন্দা তথ্য কতটা ভাগাভাগি হয়
তবে বাড়িটি যে উঠতে শুরু করেছে, সেটিও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ১৩ আগস্ট তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তিন দেশ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক-সামরিক সমন্বয়ব্যবস্থা গড়বে। যৌথ মহড়া হবে স্থল, নৌ ও আকাশে। অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শুধু অস্ত্র কেনা নয়, যৌথ গবেষণা, উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তি সহযোগিতাও আলোচনায়।
গল্পটি আকর্ষণীয়। সৌদি আরবের কাছে টাকা আছে। তুরস্কের কাছে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আছে। পাকিস্তানের কাছে আছে বড় সামরিক বাহিনী, দীর্ঘ যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ কাঠামো এবং তুলনামূলক কম খরচে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সক্ষমতা। অর্থাৎ একজনের পকেট, একজনের কারখানা, আরেকজনের সেনাবাহিনী। একই টেবিলে বসা গেলে ফল খারাপ হওয়ার কথা নয়।
সৌদি আরবের হিসাবটি সবচেয়ে পরিষ্কার। বহু বছর ধরে তাদের নিরাপত্তার বড় ছাতাটি ছিল আমেরিকা। সেই ছাতা এখনো আছে। কিন্তু গত এক দশকের মধ্যপ্রাচ্য এবং সাম্প্রতিক সময়ে তেহরান রিয়াদকে একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে -ছাতা মার্সিডিজ বেঞ্জের হতে পারে কিন্তু বৃষ্টি কারও অনুমতি নিয়ে নামে না। ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র, লোহিত সাগরের অস্থিরতা, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা— সব মিলিয়ে সৌদিরা বুঝেছে, এক দোকান থেকে নিরাপত্তা কেনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রয়টার্স-এর বিশ্লেষণও এই প্রবণতাকে সৌদি আরবের strategic hedging বা ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখেছে। রিয়াদ আমেরিকাকে বিদায় বলছে না; বরং বলছে, “আপনি থাকুন, তবে অন্যদের নম্বরটাও রেখে দিই।”
পাকিস্তানের লাভটিও কম নয়। দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে। অন্যদিকে সামরিক প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের সবচেয়ে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো। মক্কা চুক্তি ইসলামাবাদকে সৌদি অর্থ, তুর্কি প্রযুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন গুরুত্ব দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটু ঠান্ডা মাথা দরকার। পাকিস্তানে কেউ যদি মনে করেন, আগামী ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে সৌদি আরব সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবিমান পাঠাবে তবে তিনি চুক্তির চেয়ে নিজের প্রত্যাশাকে বড় করে দেখছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর। রিয়াদ পাকিস্তানের বন্ধু হতে পারে; তার মানে দিল্লিকে শত্রু বানাবে, এমনটা ভাবা মানেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিবিধি না বোঝারই সামিল। কারণ রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব বিয়ের মতো নয়। এখানে একসঙ্গে একাধিক সম্পর্ক রাখা অপরাধ নয়; বরং প্রায় বাধ্যতামূলক।
ভারতও বিষয়টিকে উপেক্ষা করছে না। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, চুক্তিটি তার জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। উদ্বেগটি অমূলক নয়। সৌদি অর্থায়নে যদি তুর্কি প্রযুক্তি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পে আরও গভীরভাবে ঢোকে, তাহলে যুদ্ধ না হলেও শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। অস্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময় গুলি নয়; কখনো অস্ত্রের অস্তিত্বই অন্য পক্ষের হিসাব বদলে দেয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও গল্পটি সাদা-কালো নয়। তিন সদস্যই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র বলে চুক্তিটিকে ‘সুন্নি বলয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তেহরান প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, একে সরাসরি ইরানবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত; তুরস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আছে, ব্যবসাও আছে; সৌদি-ইরান সম্পর্কেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তেজনার পাশাপাশি সংলাপের পথ খোলা হয়েছে। অর্থাৎ সবাই প্রতিদ্বন্দ্বী, আবার প্রয়োজনমতো অংশীদারও।
এরপর আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর। তুরস্ক জানিয়েছে, মিসর ভবিষ্যতে কাঠামোটিতে যুক্ত হতে পারে। ১৪ আগস্ট কায়রো বলেছে, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সাংবিধানিক ও আইনি দিক তারা পরীক্ষা করছে। আর ২২ আগস্ট পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে ঢাকা এমন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা উদ্যোগ বিবেচনায় নিতে পারে। এটিকে বাংলাদেশের যোগদানের সিদ্ধান্ত বলা যাবে না; আপাতত এটি সম্ভাবনার দরজায় একটি হালকা টোকা মাত্র।
আগামীকাল যুদ্ধ লাগলে কে কার হয়ে গুলি চালাবে- এটা না দেখে দেখতে হবে, আগামী পাঁচ বছরে কী হয়। একটি স্থায়ী সচিবালয় তৈরি হয় কি না। যৌথ কমান্ড দাঁড়ায় কি না। তিন দেশের সামরিক বাহিনী নিয়মিত মহড়া করে কি না। সৌদি অর্থে তুরস্ক-পাকিস্তান যৌথ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প তৈরি হয় কি না। গোয়েন্দা তথ্য কতটা ভাগাভাগি হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা- চতুর্থ, পঞ্চম দেশ সত্যিই দরজায় এসে দাঁড়ায় কি না। কারণ জোটের শক্তি ঘোষণাপত্রে নয়, অভ্যাসে। একসঙ্গে ছবি তোলা সহজ। একসঙ্গে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
মক্কা চুক্তিকে তাই এখনই ‘ইসলামি ন্যাটো’ বলা বাড়াবাড়ি; আবার এটিকে তিন নেতার আরেকটি আনুষ্ঠানিক ছবি বলে উড়িয়ে দেওয়াও ভুল। এর ভেতরে নতুন বিশ্বের একটি বড় সত্য আছে। এক সময় ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলো বড় শক্তির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করত -আপনি আমাদের রক্ষা করবেন তো?
এখন প্রশ্নটি বদলেছে।
তারা ভাবছে -বড় শক্তি না করলে আমার দ্বিতীয় ব্যবস্থা কী? তৃতীয়টি কোথায়?
মক্কার চুক্তি সম্ভবত সেই দ্বিতীয়-তৃতীয় ব্যবস্থারই নাম। পৃথিবীতে বন্ধুত্ব কমে যায়নি; বিশ্বাস কমেছে। আর আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্বাস যত কমছে, জোট তত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন রসিকতা সম্ভবত এটিই ‘সবাই বন্ধু চাইছে, কারণ কেউ কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না।’
লেখক: সাংবাদিক






